২০১৭ সালে দুনিয়া কাঁপানো চুক্তিতে বার্সেলোনা থেকে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্লাবে নেইমারের দলবদল সম্পন্ন হয়। সেটাই এখন পর্যন্ত ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলবদল ফির রেকর্ড। গত বছর খেলোয়াড়টির সঙ্গে পিএসজির চুক্তি নবায়নও হয়। যদিও এখন বেজে উঠছে বিচ্ছেদের সুর। ক্লাবের সূত্র জানিয়েছে, ৩০ বছর বয়সী নেইমারকে বিদায় দিতে চায় ফরাসি জায়ান্টরা, যদিও তার বিদায়ের স্ট্র্যাটেজিটা ঠিক কী হবে, তা পরিষ্কার নয়।
পিএসজির সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়টির চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত এবং লা’কিপ জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটা ২০২৭ সাল হয়ে যাবে। ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়নরা তাকে ছেড়ে দেবে যদি ২২০ মিলিয়ন ইউরো দলবদল ফি পায়।
সম্প্রতি মার্কার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএসজির পরিচালকরা নেইমারকে বলেছেন যে তিনি যেন নতুন মৌসুম শুরুর আগেই নতুন কোনো ক্লাব খুঁজে নেন।
পাঁচ বছর আগে ফরাসি জায়ান্টদের তাঁবুতে যোগ দেন নেইমার। যদিও কিছুদিন পরই স্বপ্নভঙ্গ হয় তার। তিনি রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু বের হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি নতুন চুক্তিতে সই করেন।
পিএসজিতে মৌসুমে তার নিট বেতন ৪৫ মিলিয়ন ইউরো, আর বার্ষিক মোট আয় প্রায় ৯০ মিলিয়ন ইউরো, যা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির পরেই (ফোর্বসের তথ্য)। ১ জুলাই এই তিনজনকেই টপকে যান কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি সম্প্রতি পিএসজির সঙ্গে নতুন আকর্ষণীয় চুক্তি করেছেন।
২০১৩ সালে ব্রাজিলের স্যান্টোস থেকে বার্সেলোনায় নাম লেখান নেইমার। কাতালানদের জার্সিতে মেসি ও সুয়ারেজের সঙ্গে মিলে বিশ্বের ভয়ংকরতম আক্রমণভাগ গড়ে তোলেন তিনি। ২০১৭ সালে নতুন চ্যালেঞ্জ নেয়ার অভিযানে তিনি যোগ দেন পিএসজিতে। যদিও তার পরিকল্পনা ভুল প্রমাণিত হয়। সেখানে তিনি লিগ শিরোপা জিতলেও এখনো ক্লাবটির হয়ে ইউরোপসেরার মুকুট পাননি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার জিততে পারেননি। তাই আক্ষেপ থেকেই যায়, তিনি বার্সেলোনা কিংবা রিয়ালে খেললে হয়তো এতদিনে ব্যালন ডি’অর জিতে যেতেন। আবার ক্লাবের আক্ষেপ হলো, নেইমারকে ২২০ মিলিয়ন ইউরোতে কিনেও তাদের ইউরোপসেরার মুুকুট জয়ের ইচ্ছা পূরণ হলো না। গত মৌসুমে নেইমারের সঙ্গে পিএসজিতে যোগ দিয়েছেন মেসি। এর পরও গত মৌসুমে শেষ ষোলো থেকে বিদায় ঘটে ফরাসি ক্লাবটির।
মেসির বয়স ৩৫, আর নেইমারকে ঘিরেও বড় স্বপ্ন দেখছে না পিএসজি। ক্লাবটি বরং এ মুহূর্তে ক্লাব ফুটবলের ক্রেজ এমবাপ্পেকে ঘিরেই স্বপ্ন বুনছে। তাই তার রিয়াল মাদ্রিদ যাত্রা আটকে দিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, তিন মৌসুমে তার জন্য ৭৫ কোটি ইউরো খরচ হবে পিএসজির।
শৈশব থেকেই নেইমার যেন একটা ‘মানি মেশিন’। তেমনি উদ্দাম জীবনযাপনে দেদার ব্যয়ও করেন এই ব্রাজিলিয়ান। তার মাঠের বাইরের লাইফস্টাইল পিএসজির খুব একটা পছন্দ নয়। পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি বলে দিয়েছেন, এখন আর নষ্ট করার মতো সময় তাদের হাতে নেই, তাই কিছু খেলোয়াড়কে বিদায় নিতে হবে। তার ইঙ্গিত যে নেইমারের দিকেই, সেটা বুঝতে কারো বাকি নেই।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে নতুন মৌসুমের একাদশ নেইমারকে ছাড়াই ভাবছে পিএসজি কিংবা খেলাইফি।
নেইমারকে বিক্রি করতে পারলে বিশাল অংকের ফি যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি বেতনের খাতেও চাপ কমে আসবে ক্লাবের।
তবে কাজটি সহজ হবে না মোটেও। প্রথমত, ইউরোপের খুব কম ক্লাবই আছে যারা মৌসুমপ্রতি ৫০ মিলিয়ন ইউরো বেতন দিয়ে তাকে পুষবে। আবার এ মুহূর্তে বিদায় নিতে অনিচ্ছুক নেইমার নিজেও। তার কাছের মানুষজনই বলেছেন, ব্রাজিলিয়ান তারকা এখন ফরাসি রাজধানী ছেড়ে যেতে চান না।
ব্রাজিলিয়ান লিওনার্দোর বিদায়ের পর পিএসজির ক্রীড়া পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন লুইস ক্যাম্পোস। তিনি আসার পরই পিএসজির ড্রেসিং রুমের পরিবেশ পাল্টাতে শুরু করেছে। ক্লাবের খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কও বিরাজ করছে। যারা গত মৌসুমেও নিশ্চিত ছিলেন ভবিষ্যৎ নিয়ে, এবার তারা অনিশ্চিত দিনযাপন করছেন। আর্জেন্টাইন প্লেমেকার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া এরই মধ্যে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়ের প্রহর গুনছেন থিলো কেহরার, আবদু দিয়ালো, সার্জিও রিকো, ইদ্রিসা গুইয়ে, লিওনার্দো পারেদেস ও অ্যান্ডার হেরেরা। কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর বিদায়ও আসন্ন।
এবার নেইমারকেও বিদায় দিতে তৈরি ক্লাবটি। যদিও এখানে আর্থিক দিকটাই মুখ্য। এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের পর উয়েফা ক্লাবটির ব্যালান্স শিটের ব্যাখ্যা চেয়েছে, যেখানে ২২০ মিলিয়ন ইউরো লোকসান দেখা যায়। আবার লা লিগা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের তেবাস বেতনের পেছনে পিএসজির ৬০০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এসব কারণে কাতারি মালিকানাধীন ক্লাবটি প্রথমেই তাদের স্কোয়াডের পেছনে ব্যয় কমাতে চাইছে। এক্ষেত্রে ক্লাবটি মেসির চেয়ে নেইমারকে বিক্রিতেই বেশি আগ্রহী। আর মেসির চুক্তিটা দুই বছরের, যার মধ্যে এক বছর বাকি রয়েছে। এছাড়া নেইমারকে বিক্রি করলে অনেক বেশি ফি পাওয়া সম্ভব।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নেইমারের জাতীয় দলের সতীর্থ এবং পিএসজি ও চেলসির সাবেক ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভা বলেছেন, নেইমারের চেলসিতে যোগ দেয়া উচিত। নতুন মালিকের অধীনে চেলসিও এখন পুনর্গঠিত হচ্ছে। লন্ডনের ক্লাবে নেইমার সবই পেতে পারেন বলে ধারণা সিলভার।
মার্কা ও গোল ডটকম










