এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ কাতারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে আপনাকে বেশ কয়েকবার গুগলম্যাপে জুম ইন করতে হবে। মাত্র ১১ হাজার ৪৩৭ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট ভূখণ্ড কাতার আরব উপদ্বীপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তো বটেই, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায়ও সমান পারদর্শী দেশটি। তা না হলে আরব ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের মুকুট কাতারের শীরে উঠত না। কারণ বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়; একে ঘিরে রয়েছে ব্যবসায়িক, কূটনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অবস্থান, সম্পর্ক গঠন ও প্রদর্শনের দোলাচল। এসব কারণে কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।


গালফ করপোরেশন কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কাতার অন্যতম। প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর কাতার কেবল সম্পদেই ধনী, তা নয়। আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে এর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নাগরিকের সব ধরনের সুবিধা সমানভাবে বণ্টন ও নিশ্চিতকরণে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আরব বিশ্বের দেশগুলো সম্পর্কে খুব সাধারণ ও কমন স্টিগমা হলো এরা কনজারভেটিভ বা গোঁড়া, নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় সমতায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু কাতার যে এসব স্টিগমায় বিশ্বাস করে না, সেটা প্রমাণের জন্য ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনকে দেশটি অন্যতম সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। এসব অপবাদের দায় নিজের নাম থেকে ঝেড়ে ফেলে বিশ্ব মানচিত্রে কাতার নিজেকে প্রকাশ করতে চায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী আধুনিক একটি রাষ্ট্র হিসেবে।


কাতারে পাঁচ বছর নাগরিক জীবন অতিবাহিত করার মাধ্যমে আমার যে উপলব্ধি, এ লেখায় সেটিই প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন, সোসাইটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগে গবেষক শিক্ষার্থী হিসেবে এবং কাতার ফাউন্ডেশনে খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। আমার বিবেচনা একাডেমিক, পেশাগত এবং ব্যক্তিগত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত।


কাতার বিশ্বকাপে আমি ভলান্টিয়ার লিডার হিসেবে সম্পৃক্ত থাকছি। কাতারের আকাশে-বাতাসে বিশ্বকাপের সাজসাজ রব শুরু হয়েছে এ বছরের গোড়া থেকেই। তারও আগে ২০২০ থেকে শুরু হয় ভলান্টিয়ার নিয়োগ প্রক্রিয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোয় ভলান্টিয়ারের সম্পৃক্ততা টুর্নামেন্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিবারই ফিফা ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেয়। কেননা এত সুবিশাল আয়োজন শুধু পেইড স্টাফ দিয়ে সম্পন্ন করার চেয়ে কিছু মানুষকে ভলান্টিয়ার হওয়ার সুযোগ করে দিলে সেটা দুই পক্ষের জন্য ইতিবাচক এবং লাভজনক হয়। যারা ভলান্টিয়ার হচ্ছেন, তারা ঐতিহাসিকভাবে ফিফার মতো ইভেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তারা কোনো নগদ অর্থ পাবেন না, তবে ফিফার অফিশিয়াল সার্টিফিকেট ছাড়াও এমন অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবেন, যেগুলো হবে এক্সক্লুসিভ ও আকর্ষণীয়। সেই সঙ্গে খাবার, পরিবহন, ইউনিফর্ম এগুলো তো থাকছেই।


প্রথম দিকে কাতারের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের মাধ্যমে ফিফা অথরিটি ভলান্টিয়ার রিক্রুটমেন্ট সংক্রান্ত প্রচারণা শুরু করে। যাতে শিক্ষার্থীরা উদ্বুদ্ধ হয় এবং ফিফার সঙ্গে যুক্ত হতে আবেদন করে। আমার মনে পড়ে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমি প্রথম ই-মেইল রিসিভ করি। সেখানে বলা হয় ফিফা ২০২২-এ ভলান্টিয়ার প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হলে আবেদন করতে পারে। এটি সম্পূর্ণ ফিফা অথরিটি নিয়ন্ত্রিত একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া। আমি সে বার ব্যক্তিগত কারণে আবেদন করতে পারিনি।


পরে এ বছরের মার্চে আমি আবারো ই-মেইল পাই। আর দেরি করিনি। হাজারো কাজের মাঝে অফিসে বসেই ফিফা ভলান্টিয়ার ইনিশিয়াল অ্যাপ্লিকেশন পূরণ করি। এ পদক্ষেপটুকু বেশ সময়সাপেক্ষ। গাইডবুক ভালোভাবে পড়ে, বুঝে আবেদন করতে হয়। সেখানে বলা আছে, ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার জন্য ফিফায় কী কী খাত রয়েছে, জব রেসপনসিবিলিটি কী, কত সময় ধরে কাজ করতে হবে, আর কী পরিস্থিতি মাথায় রাখা জরুরিসহ নানা কিছু। মোট ৪৫টি সেক্টরে ৩০ ধরনের রোল রয়েছে, যেগুলোয় ভলান্টিয়াররা কাজ করবে।


প্রত্যেক আবেদনকারী নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সেক্টর বাছাই করতে পারে। আমি নিজেই ইউনিফর্ম সেক্টরটি প্রায়োরিটি দিয়েছিলাম এবং আমাকে ফাইনালি সেখানেই নিয়োজিত করা হয়েছে। ফাইনালি বলছি কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। তিনটি ধাপে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সবশেষ ধাপ ছিল কোহেসিভটিম ওয়ার্ক ও ফেস-টু-ফেস ইন্টারভিউ। আমার মনে আছে আমি দীর্ঘ ৩৫ মিনিট টানা একটি ইন্টারভিউ দিই। ইন্টারভিউয়ের শেষের দিকে প্রশ্নকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, আমি ভলান্টিয়ার লিডার হতে ইচ্ছুক কিনা? সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিই। পরবর্তী সময়ে তারা আমাকে ভলান্টিয়ার টিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত করে।


আমার লেখা থেকে এটাও মনে হতে পারে, ফিফা অথরিটি শুধু কাতারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দিয়েছে,তা কিন্তু একেবারেই ঠিক নয়। ১৮ বছরের ওপরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে আবেদনের সুযোগ পেয়েছে। অনলাইনে প্রচারণার পাশাপাশি কাতারে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মাধ্যমেও প্রচার চালানো হয়েছে, যেন কাতারে বসবাসকারী সব অভিবাসী সমানভাবে সুযোগ পান। এমনকি যারা শ্রমিক হিসেবে কাতারে কর্মরত, তারা নিজে আবেদন করতে না পারলে তা সম্পন্ন করার জন্য নিজ দূতাবাসের সহযোগিতা নেয়ারও সুযোগ রাখা হয়েছিল। কাতার ও কাতারের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় পাঁচ লাখ আবেদন জমা পড়ে ভলান্টিয়ার হওয়ার জন্য অনলাইনে। তার মধ্য থেকে প্রায় ২৪ হাজার সৌভাগ্যবান ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জন হয়েছেন ভলান্টিয়ার লিডার। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এ সুযোগ পাওয়ায় আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।


কাতারের মোট আটটি স্টেডিয়ামের মধ্যে লুসাইল স্টেডিয়াম সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয়। ৮০ হাজারের বেশি দর্শক ধারণকারী এ স্টেডিয়ামে সেপ্টেম্বরে অফিশিয়ালি সব ভলান্টিয়ারের পরিচিতিপর্ব সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে ফিফা অথরিটির হাই অফিশিয়ালদের সঙ্গে ফুটবল সুপারস্টার ডেভিড বেকহ্যামও আমাদের স্বাগত জানান। সেদিন ভলান্টিয়ারদের অফিশিয়াল ইউনিফর্ম উদ্বোধন করা হয়। এ পোশাকের স্পন্সর বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড এডিডাস।

ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেককে একটি অফিশিয়াল অনলাইন অ্যাকাউন্ট দেয়া হয়েছে। যেখানে তার ভ্যালিড আইডেন্টিফিকেশনসহ কারেন্ট ডিটেইল প্রোফাইল থাকে। ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই জানিয়ে দেয়া হয় প্রশিক্ষণসহ ডিউটির সময়সূচিও। পুরো অক্টোবরজুড়ে আমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছি। যেহেতু ২০ নভেম্বর থেকে বিশ্বকাপ শুরু, তাই মূল ডিউটি শুরু হয় নভেম্বর থেকে, চলবে ডিসেম্বরের ফাইনাল পর্যন্ত।


প্রশিক্ষণগুলো দুই ধরনের; একটি রোল স্পেসিফিক, অন্যটি ভেন্যু স্পেসিফিক। আর আমি যেহেতু ভলান্টিয়ার লিডার, তাই আমাকে তিন ধরনের ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে হয়েছে। বাড়তি ট্রেনিংটি হলো লিডারশিপ-স্পেসিফিক ট্রেনিং। সেখানে আমাদের একজন লিডার হিসেবে কীভাবে টিমকে পরিচালনা করতে হবে এবং কীভাবে কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, শক্তি জোগাতে হবে, সে সম্পর্কে বিশদ শেখানো হয়। এছাড়া আমার টিমে যারা থাকবে, তারা আমাকে কীভাবে রিপোর্ট করবে, আমি তাদের রিপোর্ট কীভাবে কম্পাইল করব, কোথায় জমা দেব, কাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখতে হবে, সেগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত জানানো হয়েছে।


এরই মাঝে একদিন আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভলান্টিয়ার সেন্টারে। সেখানে অ্যাক্রিডিটেশন সম্পন্ন করে ইউনিফর্ম দেয়া হয়। ওই দিনটি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের ছিল, কারণ সেদিনই কাঙ্ক্ষিত পোশাক হাতে পেয়েছিলাম। আমরা যেসব পোশাক পরব, অনুষঙ্গ ব্যবহার করব অর্থাত্ পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব পরিধেয় স্পন্সর করেছে এডিডাস। এর মধ্যে রয়েছে এক জোড়া জুতা, যারা হিজাব পরতে চান তাদের জন্য একটি করে হিজাব, তিনটি টি-শার্ট, দুটি ট্রাউজার, একটি জ্যাকেট, আরেকটি লং জ্যাকেট, তিন জোড়া মোজা ও একটি ব্যাগ। ফিফা ভলান্টিয়ার জার্নিতে যোগ হয়েছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইভেন্টে বিনামূল্যে অংশ নেয়ার সুযোগ।


এছাড়া ভলান্টিয়াররা আরো যে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সেগুলো সম্পর্কে বলতে গেলে লেখা আরো দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে এটুকু হলফ করে বলতে পারি, এটি একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২২-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারা আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় বিষয়। তেমনি করে হয়তো বা আমার নামও খুব ছোট করে হলেও ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এটাই আমার কাছে অনেক গর্বের।


সবশেষে আমি এটা বলতে চাই, ভলান্টিয়ার নির্বাচনে সত্যিকার অর্থেই যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কে কোন দেশ থেকে এসেছে, কার পাসপোর্টের রঙ কী, সেসব বিষয় এক্ষেত্রে ছিল একেবারেই গৌণ। সেটা বুঝতে পেরেছি যখন আমি ট্রেনিংগুলোয় অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হই। সেখানে বাঙালিদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছে এ ইন্টারন্যাশনাল প্লাটফর্মে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে যারা বিশ্বে কালারড হিসেবে পরিচিত তাদের আধিপত্য দেখতে পেরে। এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি ভলান্টিয়ার দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্ত হয়েছে। ফিফার আয়োজনের জন্য শুভকামনা। সে সঙ্গে শুভকামনা সব ভলান্টিয়ারের জন্যও।