বলের দখল ছিল, রক্ষণ ছিল অভেদ্য, ফলও ছিল ইতিবাচক। কিন্তু কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল চেনা ছন্দ। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র, সৌদি আরবের বিপক্ষে বড় জয় পেলেও দ্বিতীয়ার্ধের নিষ্প্রভতা, উরুগুয়ের বিপক্ষে কষ্টার্জিত ১-০—সব মিলিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল কিছুটা সংশয়। সেই সংশয়ের জবাব এল লস অ্যাঞ্জেলেসে। অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোয় গেল স্প্যানিশ আর্মাডা। মিকেল ওয়ারজাবালের জোড়া গোল আর পেদ্রো পোরোর দুর্দান্ত হেডিংয়ের গোলের চেয়েও বড় খবর স্পেন আবার স্পেন হয়ে উঠেছে। বলের গতি, পাসের ধার, দুই প্রান্তের বিস্তার, মাঝমাঠের কর্তৃত্ব আর আক্রমণে নির্মমতা—সব মিলিয়ে আবার দেখা গেল ইউরোজয়ী সেই স্পেনকে।
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এদিন মাঠে নামিয়েছিলেন তার আক্রমণাত্মক একাদশ। সৌদি আরবের বিপক্ষে যে দলটি প্রথমার্ধে ঝড় তুলেছিল, ঠিক সেই দলটিতেই তিনি পুনরায় আস্থা রাখলেন। রাইট ব্যাকে মার্কোস ইয়োরেন্তের জায়গায় পেদ্রো পোরো এবং মাঝমাঠে মিকেল মেরিনোর বদলে দানি ওলমোকে ফিরিয়ে আনেন তিনি। ম্যাচের শুরুটা অবশ্য স্পেনের জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না। অস্ট্রিয়া তাদের স্বভাবসুলভ জার্মান-ধাঁচের শৃঙ্খলা এবং শারীরিক শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। রাংনিকের কৌশল ছিল স্পষ্ট মাঝমাঠে স্পেনের পাসিংয়ের জাল ছিন্ন করা এবং সুযোগ পেলেই উনাই সিমোনের গোলমুখে প্রতি-আক্রমণ শানানো। প্রথমার্ধের প্রথম কিছু সময় অস্ট্রিয়ার এ জমাট রক্ষণভাগের কারণে পেদ্রি ও ওলমোর মতো সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়রা কিছুটা খাবি খাচ্ছিলেন। স্পেনের চেনা সেই ছোট ছোট পাসের খেলা যেন বক্সের আশপাশে এসে খেই হারিয়ে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, অস্ট্রিয়ার চক্রব্যূহে হয়তো আটকে যাবে লা রোজারা।
কিন্তু স্পেনের ডান প্রান্তে ছিল লামিনে ইয়ামাল নামের এক বিস্ময় বালক। অস্ট্রিয়ার কনরাড লাইমার এবং মার্সেল সাবিৎজারের কড়া পাহারার মাঝেও এ তরুণ উইঙ্গার ডান প্রান্তে নিজের জাদুকরী বাঁ পায়ের খেলা দেখাতে শুরু করলেন। পোরোর সঙ্গে তার রসায়ন যত জমতে শুরু করল, অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ ততটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ল। ইয়ামাল শুধু নিজেই খেললেন না, পুরো দলকে এক সুতোয় গাঁথলেন। তিনি যখন ডান দিক দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে ভেতরে ঢুকে আসছিলেন, তখন পেদ্রি আর ওলমো মাঝমাঠে নিজেদের জন্য ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলেন। অন্যদিকে, রদ্রি বরাবরের মতোই মাঝমাঠের একচ্ছত্র সেনাপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কখনো দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে নেমে এলেন, কখনো আবার পেদ্রির পাশে উঠে যাচ্ছিলেন। সেই সঙ্গে দুই ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো ক্রমেই ওপরে উঠতে থাকলেন। হঠাৎ করেই মাঠটা যেন চওড়া হয়ে গেল। মাঝখানে জায়গা পেলেন পেদ্রি ও ওলমো। স্পেনের বল পজেশন আর প্রেসিংয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অস্ট্রিয়া নিজেদের অর্ধ থেকেই ঠিকমতো বের হতে পারছিল না। স্প্যানিশ আর্মাডার নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল অস্ট্রিয়ার সীমানায়।
প্রথমার্ধের পানি পানের বিরতির পর পরই লামিনে ইয়ামালের একটি মাপা কর্নার থেকে মার্ক কুকুরেয়া বল জালে জড়ালেও রেফারি তা বাতিল করে দেন, কিপার শ্লাগারের ওপর রদ্রি ও কুবারসির ফাউল ধরা পড়েছিল। এরপর স্পেনের গোলের ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে কুকুরেয়ার মাপা এক নিচু ক্রস সোজা চলে আসে বক্সের ভেতর। আর সেখানে ওঁত পেতে ছিলেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। নিখুঁত এক ফিনিশিংয়ে তিনি বল জড়িয়ে দিলেন জালে। ১-০ গোলে এগিয়ে গেল স্পেন। গোল খাওয়ার পর অস্ট্রিয়া কিছুটা মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পাউ কুবারসি ও আইমেরিক লাপোর্তে মিলে অস্ট্রিয়ার আক্রমণভাগের সামনে যে দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন, তা ভাঙার সাধ্য যেন কারো ছিল না। প্রথমার্ধের শেষ দিকে স্পেনের ব্যবধান দ্বিগুণ হতে পারত, কিন্তু অ্যালেক্স বায়েনার একটি অসাধারণ ফ্রি-কিক দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে এবং ফিরতি বলে ইয়ামালের শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক শ্লাগার। এক গোলে এগিয়ে থেকেই প্রথমার্ধের বিরতিতে যায় স্পেন।
দ্বিতীয়ার্ধে রাংনিক একের পর এক পরিবর্তন এনে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। অস্ট্রিয়া নিজেদের অর্ধেই আটকে পড়ে। কুবারসি ও লাপোর্তে এতটাই উঁচু লাইনে খেলছিলেন যে মাঝমাঠ প্রায় স্পেনের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগের প্রতিটি পাসে ছিল শিল্পের নিখুঁত ছোঁয়া, যেন মাঠে কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং এক সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা চলছে।
স্পেনের দ্বিতীয় গোলটি আসে ম্যাচের ৬৫তম মিনিটে। কুকুরেয়া বাঁ প্রান্তে বল দখল করে তা বাড়িয়ে দেন বায়েনার উদ্দেশে। বায়েনা দারুণ দক্ষতায় বলটি বক্সের ভেতর ভাসিয়ে দেন, আর সেখানে একজন নিখাদ স্ট্রাইকারের মতো আবির্ভূত হয়ে দুর্দান্ত হেডারে বল জালে জড়ান রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোরো। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণ কীভাবে উইং দিয়ে এসে পূর্ণতা পায়, তার এক নিখুঁত জ্যামিতিক উদাহরণ ছিল গোলটি।
এর পর দে লা ফুয়েন্তে একে একে মাঠে নামান ফেরান তোরেস, মিকেল মেরিনো, গাভি ও ফাবিয়ান রুইজদের। এমনকি মার্ক পুবিলের মতো তরুণ খেলোয়াড়ও বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক সেরে ফেলেন।
ম্যাচের একেবারে অন্তিম লগ্নে যখন রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক সেই ইনজুরি টাইমে স্পেনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন সেই ওইয়ারজাবাল। এবারো সেই বাঁ প্রান্ত থেকে কুকুরেয়ার নিখুঁত এক অ্যাসিস্ট, আর ওইয়ারজাবালের অসাধারণ এক ভলি।
গোলরক্ষক উনাই সিমোন এ ম্যাচে কোনো বড় ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হননি বললেই চলে। তবে এর মাঝেই তিনি গড়ে ফেলেছেন এক অনন্য রেকর্ড। টানা ৫২২ মিনিট বিশ্বকাপে কোনো গোল হজম না করে তিনি স্পেনের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ম্যাচ শেষে স্পেনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নয়, নিজেদের চেনা রূপে ফিরে আসা। শিল্প, ক্ষিপ্র পাসিং, নিরন্তর আগ্রাসন আর কৌশলগত শৃঙ্খলা সবকিছুই যেন আবার নিখুঁত ছন্দে মিলেছে লা রোজার খেলায়। ওইয়ারজাবালের দুর্দান্ত ফিনিশিং, ইয়ামালের জাদু, কুকুরেয়ার অবিশ্রান্ত ছুটে চলা এবং মাঝমাঠের নিরঙ্কুশ আধিপত্যে নতুন করে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে স্পেন। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই আগামী সোমবার ডালাসে আইবেরীয় ডার্বিতে পর্তুগালের মুখোমুখি হবে স্প্যানিশরা।










