গতকাল সকালে ‘এফ’ গ্রুপের ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ‘ব্লু সামুরাইরা। এটি ছিল ছেলেদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে হাজারতম ম্যাচ। এ ম্যাচেই দেখা গেল জাপানের অনবদ্য প্রদর্শনী।
বিশ্বকাপের হাজারতম ম্যাচেই জাপান তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ চারটি গোল করার রেকর্ড গড়েছে। অন্যদিকে তিউনিসিয়ার জন্য এটি ছিল আরেকটি বড় ধাক্কা। প্রথম ম্যাচেই সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর কোচ সারবি লামুচিকে বিদায় করে আরব দেশটি। অন্তর্বর্তী কোচের দায়িত্ব নেন খ্যাতিমান কোচ হার্ভে রেনো। টুর্নামেন্ট শুরুর পরই কোচ পরিবর্তন করা প্রথম দল তারা। নতুন কোচেও ভাগ্যের বদল হয়নি। এবার দ্বিতীয় ম্যাচে তারা এশিয়ার দেশ জাপানের কাছে হারল ৪-০ গোলের বড় ব্যবধানে।
জাপানের হয়ে জোড়া গোল করেন আয়াসে উয়েদা। পাশাপাশি গোল করেন দাইচি কামাদা ও জুনিয়া ইতো। এ জয়ে নেদারল্যান্ডসের সমান চার পয়েন্টে পৌঁছে গেছে জাপান। দুই ম্যাচে এক গোল বেশি করার কারণে নেদারল্যান্ডস শীর্ষে রয়েছে। ডাচরা শনিবার রাতে ৫-১ গোলে হারায় সুইডেনকে।
গতকালের হারে টুর্নামেন্ট থেকে তিউনিসিয়ার বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। জাপান অন্তত গ্রুপে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে, যা তাদের নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল করেছে। নেদারল্যান্ডস ও জাপান উভয়ের ঝুলিতে সমান ৪ পয়েন্ট। আর সুইডেন ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে রয়েছে। এ তিন দলই এখন নকআউটের রেসে আছে। শুক্রবার ভোর ৫টায় জাপান খেলবে সুইডেনের বিপক্ষে, একই দিন একই সময়ে নেদারল্যান্ডসের প্রতিপক্ষ তিউনিসিয়া। অর্থাৎ ডাচদের নকআউটে উত্তরণ সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বাকি টিকিটের জন্য লড়াই হবে জাপান ও সুইডেনের মধ্যে।

মেক্সিকোর মন্টেরেই স্টেডিয়ামে ‘ব্লু সামুরাই’খ্যাত জাপানিরা রীতিমতো উড়েছে। ম্যাচের শুরুতেই আঘাত হানে হাজিমে মরিয়াসুর দল। চতুর্থ মিনিটেই গোল করেন দাইচি কামাদা। কেইতো নাকামুরার ক্রস থেকে দারুণ পজিশনে থাকা কামাদা বলটিকে সহজেই জালে পাঠান। এটি ছিল তার টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় গোল এবং বিশ্বকাপে জাপানের দ্রুততম গোল।
৩১তম মিনিটে আসে জাপানের দ্বিতীয় গোল। মাঝমাঠে বল পেয়ে একাই তিউনিসিয়ার বক্সের দিকে এগিয়ে যান উয়েদা আয়াসে। তাকে থামাতে পারেননি তিউনিস ডিফেন্ডাররা। তিনি এ মৌসুমে ক্লাব ফুটবলেও দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। ফেনুর্ডের হয়ে নেদারল্যান্ডসের লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার (২৪ গোল) পুরস্কার জিতেছিলেন। এবার বিশ্বকাপেও সেই ফর্ম ধরে রাখলেন তিনি।
প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধেও সমান দুটি গোল আদায় করে নেয় জাপান। ৬৯তম মিনিটে দলের তৃতীয় গোলটি করেন জুনিয়া ইতো। ৮৩তম মিনিটে উয়েদা আবারো জ্বলে ওঠেন। তার দুর্দান্ত লুপিং হেডারে আসে ম্যাচের চতুর্থ গোল, যা জাপানের দাপুটে জয়কে সম্পূর্ণ করে। গতকালের জয়ে এটা নিশ্চিত হলো, ২০১৯ সালের পর থেকে ৯০ মিনিটের মধ্যে কোনো ইউরোপীয় দলের কাছে হারেনি জাপান।
টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে জাপানের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাজিমে মরিয়াসু পরের ম্যাচেও দলের কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স চান। তিনি বলেন, ‘আমরা যত বেশি সম্ভব গোল করতে পারব, এটা দলকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। এমনটি আমরা সুইডেনের বিপক্ষেও করতে চাইব।’
বিদায় নিশ্চিত হওয়া তিউনিসিয়াকে শেষ ম্যাচে পড়তে হবে উড়ন্ত নেদারল্যান্ডসের সামনে। অন্তর্বর্তী কোচ হার্ভে রেনো এ নিয়ে বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে চেষ্টা করতে হবে যতটা সম্ভব লড়াই করা। দুই ম্যাচে দুটিতেই হেরে যাওয়ার পর এটা কঠিন হবে জানি। কিন্তু শেষটা ভালো করতে আমাদের আরো দায়িত্ব নিতে হবে, আরো পেশাদার মানসিকতা নিয়ে খেলতে হবে।’

গতকাল বিশ্বকাপে সেভের ইতিহাস গড়েছেন কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম। একুয়েডরের বিপক্ষে তিনি মোট ১৫টি সেভ করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় তার চেয়ে বেশি সেভ আর কারো নেই, যে ম্যাচে কিনা ক্লিন শিট হয়েছে। ১৯৬৬ সালে সেভকে আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান হিসেবে গণনা শুরু হয়। সেই থেকে সর্বোচ্চ ১৬ সেভের রেকর্ড গড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ওই ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতেছিল বেলজিয়াম। ম্যাচটি গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ের খেলায়। হাওয়ার্ডের সেই রেকর্ড থেকে রুম মাত্র একটি সেভ দূরে ছিলেন। রুমের নৈপুণ্যে শক্তিশালী একুয়েডরকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয় ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। ‘দ্য ব্লু ওয়েভ’খ্যাত দ্বীপদেশটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট তুলে নিয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে গ্যালারির বেশির ভাগ অংশ ছিল উজ্জ্বল হলুদ জার্সি পরা একুয়েডর সমর্থকে ভরা। বিপরীতে কুরাসাওয়ের নীল পোশাকধারী সমর্থক ছিল হাতে গোনা। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা এত বেশি যে সেখানে কুরাসাওয়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ জায়গা পেতে পারে।
একুয়েডর একের পর এক আক্রমণ চালালেও ৩৭ বছর বয়সী রুম ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বিশ্বকাপে গোলরক্ষকের করা সেভের সংখ্যার দিক থেকে এটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
ম্যাচের শুরুতেই একুয়েডরের অভিজ্ঞ ফরওয়ার্ড এন্নার ভ্যালেন্সিয়া গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু কুরাসাও গোলকিপার রুম অনেকটা অবিশ্বাস্যভাবে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে শট ঠেকিয়ে দেন। প্রথমার্ধে কুরাসাও কয়েকটি ভালো আক্রমণ গড়ে তোলে। ৭৮ বছর বয়সী কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের দল বারবার একুয়েডরের রক্ষণদেয়াল ভেদ করলেও শেষ পাস বা শটের দুর্বলতায় গোলের দেখা মেলেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে একুয়েডরের চাপ আরো বাড়ে। মইসেস কাইসেদোর জোরালো প্রচেষ্টা এলোয় রুম চমৎকার দক্ষতায় রুখে দেন। এরপর ভ্যালেন্সিয়ার হেডও তিনি পোস্টের বাইরে পাঠিয়ে দেন। কর্নার থেকে আসা পরবর্তী আক্রমণেও টানা দুটি দুর্দান্ত সেভ করেন রুম, এরপর বল ক্লিয়ার করতে সক্ষম হয় কুরাসাও।
শেষ পর্যন্ত পুরো ম্যাচ জুড়েই রুম ছিলেন একুয়েডরের সামনে অদম্য প্রাচীর। তার বীরত্বেই বিশ্বকাপের মঞ্চে স্মরণীয় এক পয়েন্ট অর্জন করে কুরাসাও।
জয়ের সমান ড্র শেষে কুরাসাও গোলকিপার এলোয় রুম অনেকটা মজার ছলে বলেছেন, কুরাসওয়ে তার একটি ভাস্কর্য হোক, এ দাবি তিনি করতেই পারেন। ৩৭ বছর বয়সী এ গোলকিপার বলেন, ‘এটা পরাবাস্তব। যেখান থেকে আমাদের যাত্রা হলো এবং এখন যেখানে আছি। আমরা দেখিয়েছি, আমাদের সত্যিকারের হৃদয় আছে, এটা অবিশ্বাস্য অনুভূতি। আমি জানি, অসংখ্য সেভ। করেছি। জানি, এটা দীর্ঘদিনের একটি রেকর্ডও, কাজেই আমি গর্বিত। সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। প্রথম সেভটি আমাকে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। এরপর জানতাম, আমার জন্য ব্যস্ততম একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কিছুটা হতাশ, কারণ আমাদের গোল করার সুযোগও এসেছিল। আমাদের জন্য এটা জয়ের সমান। আমি তো মনে করি, আগামী ৪০ বছর এটা আমরা মনে রাখব। আমি মনে করি, কুরাসাওতে এখন আমার একটি ভাস্কর্য দরকার।’
এ ড্রয়ের ফলে কোনো দলই নকআউট পর্বের দৌড় থেকে ছিটকে যায়নি। তবে গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচের আগে একুয়েডরের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। গ্রুপের আরেক ম্যাচে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘ই’ থেকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে জার্মানি। কুরাসাও প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে যায়, আর একুয়েডরকে ১-০ গোলে হারায় আইভরি কোস্ট। ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দুইয়ে আইভরি কোস্ট। বৃহস্পতিবার রাতে কুরাসাওকে হারালেই নকআউট পর্বের টিকিট পাবে আফ্রিকার ‘হাতি’রা। শেষ ম্যাচে জার্মানির প্রতিপক্ষ একুয়েডর। এক পয়েন্ট হাতে নিয়ে শেষ ম্যাচে জার্মানিকে হারানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে লাতিন দলটি।









