আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জার্মানির বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (বার্লিনাল)। বিশ্বখ্যাত অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা এক খোলা চিঠির মাধ্যমে গাজায় চলা সংঘাত ঘিরে উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থানকে সমালোচনা করেছেন। ফলে উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ওই চিঠিতে বিশ্বখ্যাত তারকা হাভিয়ের বারদেম, টিল্ডা সুইন্টন ও অ্যাডাম ম্যাকেসহ ৮১ জন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে তারা বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ভয়াবহ সহিংসতার বিষয়ে আমাদের শিল্প ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনোভাবেই সহযোগী না হয়, আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি।’ একই সঙ্গে তারা উৎসবের ‘নীরবতা’ ও শিল্পীদের বক্তব্য দমনের অভিযোগে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন মার্ক রাফালো, কেন লোচ ও ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ সিনেমার প্রযোজক জেমস উইলসনসহ বার্লিন উৎসবে বর্তমান ও সাবেক অনেক অংশগ্রহণকারী। তাদের অভিযোগ, গাজা প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে মত দেয়া শিল্পীদের ওপর উৎসব কর্তৃপক্ষ চাপ সৃষ্টি করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেন্সরশিপের আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
খোলা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছর বার্লিনালের মঞ্চ থেকে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা কয়েকজন নির্মাতাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছিল। এমনকি একজন নির্মাতার বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তের কথাও তুলে ধরা হয়।
২০২৬ সালের আসরে বিতর্ক আরো তীব্র হয় জুরিপ্রধান ভিম ভেন্ডার্সের মন্তব্যকে ঘিরে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত।’ চলচ্চিত্র নির্মাণকে ‘রাজনীতির বিপরীত’ বলে মন্তব্য করেন। তার এ বক্তব্য সমালোচনার জন্ম দিলে উৎসবপ্রধান ট্রিসিয়া টাটল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘উৎসবের অতীত বা বর্তমান চর্চা নিয়ে বিস্তৃত বিতর্কে শিল্পীদের মন্তব্য করতে বাধ্য করা উচিত নয়, বিশেষত যেগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।’
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা ভেন্ডার্সের বক্তব্যের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন। তাদের ভাষায়, ‘চলচ্চিত্র ও রাজনীতিকে আলাদা করা যায় না। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। পাঁচ হাজারের বেশি চলচ্চিত্রকর্মী এরই মধ্যে ইসরায়েলি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ না করার ঘোষণা দিয়েছেন।’
চিঠির উপসংহারে স্বাক্ষরকারীরা মনে করিয়ে দেন, অতীতে ইরান ও ইউক্রেনের মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার বিষয়ে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল। তাই এবারো তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করে ফিলিস্তিনিদের জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়া এবং শিল্পীদের অবাধ মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
এদিকে বার্লিনাল কর্তৃপক্ষ ‘অরাজনৈতিক’ অবস্থানের কথা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় এ উৎসব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বের কোটি মানুষের মতো আমিও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্যদের সেই বিবেকবর্জিত বক্তব্য শুনেছি। শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়, এমন কথা শোনা স্তম্ভিত করার মতো। এটি মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি অপরাধ নিয়ে আলোচনাকে থামিয়ে দেয়ার কৌশল, যখন সে অপরাধ আমাদের চোখের সামনে বাস্তব সময়ে ঘটছে। এ সময় শিল্পী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উচিত তাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তা থামানোর চেষ্টা করা।’
সূত্র: ভ্যারাইটি










