প্রায় ১৮ কোটি রুপি বাজেটের বিপরীতে ভারতে নেট আয় ছিল মাত্র ৭ কোটি ৭৬ লাখ রুপি। বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ১২ কোটি ১৮ লাখ রুপি। বাণিজ্যিক বিচারে সিনেমাটি ছিল ফ্লপ। কিন্তু সিনেমার বাণিজ্যিক জীবন আর সাংস্কৃতিক জীবন যে এক জিনিস নয়, আওয়ারাপান তার একটি উদাহরণ সামনে এনেছে।
প্রায় দুই দশক পর ১৪ আগস্ট ‘আওয়ারাপান টু’ মুক্তির পর সে পুরনো ব্যর্থ সিনেমাটিই যেন নতুন করে নিজের দর্শক খুঁজে পেল। প্রথম দুদিনেই সিনেমাটি ভারতে আয় করেছে ৫৫ কোটি ৭৫ লাখ রুপি। এছাড়া এর গ্রস আয় ৬৬ কোটি ৯০ লাখ রুপি এবং বৈশ্বিক মোট আয় ৭২ কোটি ৯০ লাখ রুপি। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, যে সিনেমা ২০০৭ সালে দর্শক টানতে পারেনি, ১৯ বছর পর তার সিকুয়াল কেন এত দর্শক টানছে?
আওয়ারাপান ছিল মূলত অপরাধ, প্রেম, অপরাধবোধ ও আত্মমুক্তির গল্প। মূল চরিত্র শিবম পণ্ডিত ছিলেন একজন সহিংস, নাস্তিক, ভেতর থেকে ভেঙে পড়া মানুষ, যে জীবনের প্রতি প্রায় সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর এক নারীর জীবনে প্রবেশ তার সামনে খুলে দেয় অন্য এক সম্ভাবনা।
সিনেমাটি দক্ষিণ কোরীয় ‘আ বিটারসুইট লাইফ’ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও মোহিত সুরি ও লেখক শাগুফতা রফিক সেটিকে ভারতীয় আবেগ, অপরাধজগত ও আত্মত্যাগের ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু দর্শক টানতে পারেনি। বক্স অফিসে ফ্লপ হওয়ার পর টেলিভিশন, ইউটিউব, অনলাইন প্লাটফর্ম এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সিনেমাটিকে নতুনভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে থাকে। ফলে আওয়ারাপান ধীরে ধীরে বক্স অফিসের ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে কাল্ট ফিল্মে পরিণত হয়। এর পেছনে বলা যেতে পারে একমাত্র অন্যতম প্রভাবক ছিল তার সংগীত। প্রীতমের সুর ও সাঈদ কাদরির কথায় ‘তো ফির আয়ো’, ‘তেরা মেরা রিশতা’, ‘মাহিয়া’ কিংবা ‘মওলা মওলা’ হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের আবেগের শব্দভাণ্ডার। গানগুলো সিনেমাটির বিষণ্নতাকে এমনভাবে ধারণ করেছিল, যা সিনেমার দৃশ্যের বাইরে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। আওয়ারাপানের যে সংগীত মানুষের জীবনে স্মৃতির ভাণ্ডার তৈরি করেছিল, আওয়ারাপান টু’ সে ভাণ্ডার আরো প্রসারিত করেছে। সিকুয়ালের সংগীতে ফিরে এসেছেন মিথুন ও সাঈদ কাদরি, নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গে সে পুরনো আবেগের সেতু তৈরি করতে যুক্ত হয়েছে নতুন সংগীতও। অর্থাৎ নির্মাতারা শুধু পুরনো গান ফিরিয়ে আনেননি, তারা আসলে পুরনো অনুভূতিকে নতুন সাউন্ডস্কেপে পুনর্গঠন করেছেন।
তবু সবকিছুর কেন্দ্রে একজনই, শিবম পণ্ডিত। ২০০৭-এর ইমরান হাশমি আর ২০২৬-এর ইমরান হাশমি এক মানুষ নন। ২০০৭ সালে যারা কিশোর বা তরুণ বয়সে আওয়ারাপান দেখেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ ৩০ বা ৪০-এর কোঠায়। কেউ চাকরি করছেন, কেউ সংসার: কেউবা সম্পর্ক হারিয়েছেন, কেউ বিয়ে করেছেন; আবার কেউ দেখেছেন বিচ্ছেদ, কেউ হারিয়েছেন প্রিয় মানুষ। ১৯ বছরে তাদের জীবন বদলে গেছে। এ কারণেই নস্টালজিয়া এত শক্তিশালীভাবে কাজ করছে দর্শকের ভেতর। তাই ইমরান হাশমিকে দেখানো হয়েছে আরো ধীর, স্থির ও পরিণত। কারণ নির্মাতারাও বুঝে গিয়েছিলেন, কী বিক্রি করতে হবে।
আওয়ারাপান টুয়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিপণন কৌশলগুলোর একটি ছিল সময়কে ব্যবহার করা। সিনেমাটির টিজার প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের ২৯ জুন, মূল আওয়ারাপান মুক্তির ঠিক ১৯তম বার্ষিকীতে। বার্তাটি ছিল খুব সহজ, ১৯ বছর আগে এ গল্প যেখানে থেমেছিল, সেখানেই কি তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছ?
ডিজিটাল যুগে দর্শক এখন শুধু দর্শক নয়, সে নিজেই প্রচারের অংশ। পুরনো দৃশ্যের ক্লিপ, ইমরানের তরুণ বয়সের সিনেমা, গানের সঙ্গে তৈরি রিল, ‘আমি সিনেমাটা স্কুলে দেখেছিলাম’ ধরনের পোস্ট—প্রতিটি স্মৃতি পরিণত হয়েছে নতুন সিনেমার বিজ্ঞাপনে।
নতুন সিকুয়ালটি পরিচালনা করেছেন নিতিন কক্কর, চিত্রনাট্য লিখেছেন বিলাল সিদ্দিকি এবং প্রযোজনা করেছেন বিশাল ভাট। ইমরান হাশমির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন দিশা পাটানি ও শাবানা আজমি। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে বিষ্ণু রাও, সম্পাদনায় দেবেন্দ্র মুরদেশ্বর এবং প্রডাকশন ডিজাইনে টিনা পারদকর।










