একজন নায়ক হিসেবে সময়কে অতিক্রম করে হয়েছেন কিংবদন্তি। নায়ক, পরিচালক, প্রযোজক সব ভূমিকায় সফল তিনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তার নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারিত হয়।

আজ ৩ এপ্রিল আলমগীরের ৭৭তম জন্মদিন। ১৯৫০ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্ম তার। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার তেজগাঁও এলাকায়। কলেজজীবনে নাটকের মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই বড় পর্দার পথে যাত্রা।

১৯৭২ সালে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান ‘আমার জন্মভূমি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন প্রয়াত বরেণ্য পরিচালক আলমগীর কুমকুম। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্রমে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নায়ক। পরে আলমগীর সিরাজুল ইসলামের ‘দস্যুরানী’ (১৯৭৪), আজিজুর রহমানের ‘অতিথি’, আলমগীর কুমকুমের ‘মমতা’, মোহর চাঁদের ‘হীরা’ সিনেমায় কাজ করেন। সব সিনেমাই তখন আলোচিত ও জনপ্রিয় হয়।

১৯৭৫ সালে তিনি শাবানার বিপরীতে ‘চাষীর মেয়ে’ ও কবরীর বিপরীতে ‘লাভ ইন শিমলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এ দুটি সিনেমা তাকে আরো জনপ্রিয় করে। দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন দ্রুত।

১৯৭৮ সালে ‘জিঞ্জির’ ছিল তার ক্যারিয়ারে মোড় ঘোরানো কাজ। এতে রাজ্জাক ও সোহেল রানার সঙ্গে অভিনয় করেন। প্রতিষ্ঠিত নায়কদের মাঝেও নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হন। অভিনয়ে তার বৈচিত্র্য ছিল অসাধারণ। পারিবারিক, সামাজিক, অ্যাকশন, রোমান্টিক সব ধারায় দক্ষতা দেখান। ফোক ঘরানার সিনেমায়ও ছিল তার উপস্থিতি।

পরিচালক, প্রযোজক ও প্লেব্যাক

১৯৮৫ সালে ‘নিষ্পাপ’ ছবি দিয়ে আলমগীরের চলচ্চিত্র পরিচালনায় অভিষেক হয়। পরিচালক হিসেবেও তিনি প্রশংসিত। তার সর্বশেষ পরিচালিত সিনেমা ‘একটি সিনেমার গল্প’। এখানে তিনি নিজেও অভিনয় করেন। প্রযোজক হিসেবেও রয়েছে অবদান। তার প্রথম প্রযোজিত সিনেমা ‘ঝুমকা’। বহুমাত্রিক প্রতিভা তাকে আলাদা করেছে। একসময় রাজধানীর গ্রিনরোডে একটি স্কুলে কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর কাছে গানও শিখেছিলেন আলমগীর। পরে মোস্তফা মেহমুদের ‘মনিহার’ সিনেমায় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সত্য সাহার সুর সংগীতে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন তিনি।

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৮৫ সালে কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘মা ও ছেলে’ সিনেমায় দীপক চৌধুরী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর আরো অনেকবার এ পুরস্কার জিতেছেন। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও পার্শ্বচরিত্র দুই বিভাগেই তার সাফল্য। ‘অপেক্ষা’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পিতা মাতা সন্তান’, ‘মরণের পরে’, ‘অন্ধ বিশ্বাস’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘কে আপন কে পর’, ‘জীবন মরণের সাথী’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনিই বাংলাদেশের নায়কদের মধ্যে সর্বোচ্চবার এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

২০১৯ সালে পান আজীবন সম্মাননা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সম্মানজনক অর্জন। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন আলমগীর।

আলমগীরের সহধর্মিণী ‍উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। দুজনের সম্পর্ক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার উদাহরণ। জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রুনা লায়লা বলেন, ‘আমার ভীষণ ভালো লাগার, ভালোবাসার মানুষ তিনি। আল্লাহর অশেষ রহমত যে তিনি সুস্থ আছেন, ভালো আছেন, আমাদের মাঝে আছেন, আমাদের সঙ্গে আছেন। তার সঙ্গে সবসময় আমার দারুণ বোঝাপড়া, যেকোনো বিষয় নিয়েই আমি তার সঙ্গে আলোচনা করি। তবে আমার খুব দুঃখ হয় তিনি যে ধরনের ট্যালেন্টেড একজন অভিনেতা, সে হিসেবে তার ট্যালেন্টকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। আমার বিশ্বাস যদি আগামীতে তার কোনো চরিত্র বা কোনো গল্প ভালো লাগে, তাহলে আবারো তিনি অভিনয় করতেও পারেন। অনেক উদার মনের আমার জীবনসঙ্গী এবং অনেক বড় মনের এ মহায়নায়কের প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।’

আজ ৭৭ বছরে পা দিচ্ছেন প্রজন্ম পেরিয়ে জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া নায়ক আলমগীর। তার জীবন এক দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা ও সফলতার গল্প। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য নাম।