হিমালয়ের কোলে এক নির্জন আর নয়নাভিরাম আপেল বাগান এবং বিশাল বাংলোর মালিক দেব। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। বিশাল এ এস্টেটের দেখাশোনার জন্য রয়েছে বিশ্বস্ত ম্যানেজার মোহন। কিন্তু এ শান্ত জীবনে হঠাৎ ঝড় ওঠে, যখন রাতের অন্ধকারে রহস্যজনকভাবে বাগানের গাছে একের পর এক আগুন জ্বলতে শুরু করে। কে বা কারা আগুন দিচ্ছে—স্থানীয় শ্রমিক, যাযাবরের দল নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তি? এ উত্তর খুঁজতে গিয়েই উন্মোচন হয় তাদের পরিবারের অতীত, সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের টানাপড়েন।

এমন গল্প নিয়েই রাম রেড্ডির সিনেমা ‘জুগনুমা: দ্য ফেবল’। গল্প লিখেছেন রাম নিজে, সঙ্গে বরুণ গ্রোভার ও সিদ্ধার্থ অরোরা সেহের। ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ নিয়ে ভারতীয় সিনেমায় কাজ হয়েছে খুব কম। সেখানে এ গল্প এক অদ্ভুত সংযোজন। উত্তরাখণ্ডের অ্যাবট মাউন্টে ১৬ মিমি ফিল্মে শুট করা জুগনুমা কাব্যিক এক আবহ তৈরি করে।

সিনেমাটির গল্পে অন্তত দুটো স্তর আছে। ওপরের স্তরে দেবের পরিবারের পরিচিত জীবনযাপন। বিপরীতে শান্ত গ্রামের সাধারণ মানুষ। পাঁচ হাজার একরের এস্টেটে কাজ করে গ্রামের মানুষ। তারা কি দেবের পরিবারের প্রতি বিরূপ? তেমনটা বোঝা যায় না। রাম রেড্ডি এ গল্পে সরাসরি শ্রেণীসংঘাতের বয়ান রাখেননি। রেখেছেন রূপকথা। কেশবের স্ত্রী তার সন্তানদের সে রূপকথা শোনান, কীভাবে পরিদের রাজ্য থেকে কিছু ‘মানুষ’ মানুষের পৃথিবীর মায়ায় পড়ে।

নিয়মিত জীবনযাপনের বাইরে দেবের আছে এক অদ্ভুত নেশা। ওড়ার নেশা। বাড়ির আউটহাউজের ওয়ার্কশপে কৃত্রিম ডানা তৈরি করে সে। তারপর পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে উড়ে বেড়ায়। তার এ ওড়ার মধ্যে যেমন এক অদ্ভুত মুক্তি আছে, তেমনই আছে এক ধরনের অহংকার। কিন্তু মনোজের চোখের দৃষ্টি ও নীরবতায় এক করুণ আবেদন ফুটে উঠেছে। যেন পুরনো দিনের রূপকথার গল্পের দুঃখী রাজকুমার। এমন এক মানুষ, যে উড়তে চায়, অথচ তার শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত।

নীরব উপস্থিতি দিয়েই মনোজ বাজপেয়ী পুরোটা সময় দর্শককে আটকে রাখেন। তার চোখের দ্বিধা, তার শরীরী ভাষার জড়তা যেন কথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু বলে দেয়। প্রিয়াংকা বোস (নন্দিনী) আর তিলোত্তমা সোমও নিজেদের চরিত্রে এক অদ্ভুত স্থিরতা এনেছেন; যেন তারা জানেন এ গল্পের গভীরে কী লুকিয়ে আছে, কিন্তু বলতে চান না।

ম্যানেজারের চরিত্রে দীপক দোব্রিয়াল মালিকের আনুগত্য ও স্থানীয় শ্রমিকদের প্রতি মমত্ববোধের মাঝে আটকে থাকা এক সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ লোককথার কথক তিনিই। ভয়েস ওভারে মনে হয়, এ পুরো ঘটনা হয়তো তিনিই তার নাতি-নাতনিদের এক গ্রীষ্মের রাতে শোনাচ্ছেন। যখন বিদ্যুৎ নেই আর মাথার ওপর জ্বলছে তারায় ভরা আকাশ।

১৬ মিমিতে শুট করা সিনেমায় পাহাড়ের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। অদ্ভুত সব দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। দেখার সময় মনে হয় যেন কেউ পাহাড়ি রাতের নিস্তব্ধতায় বসে একটা প্রাচীন লোককথা শোনাচ্ছে, যেখানে সত্যি আর মায়ার মাঝের সীমারেখা ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে। বিশাল এ এস্টেটের আপেল বাগান স্থানীয়দের কর্মক্ষেত্র, অন্যদিকে এ আপেল বাগান মানুষের জন্য অভয়ারণ্য। দূর পাহাড় থেকে যাযাবরের দল এসে তাঁবু ফেলছে এস্টেটে, এতে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাহাড়, মানুষ, গাছের ফুল—সব মিলিয়ে চমৎকার দৃশ্য।

সিনেমার সাউন্ড ডিজাইন অত্যন্ত সূক্ষ্ম। পাহাড়ি হাওয়ার শব্দ, আগুনের চটচট শব্দ কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকা ও জোনাকির গুঞ্জন দর্শককে সরাসরি উত্তরাখণ্ডের সেই নির্জন উপত্যকায় নিয়ে যায়। সুনীল বোরকরের চিত্রগ্রহণ এ সিনেমার সবচেয়ে গোপন শক্তি। প্রতিটি ফ্রেম যেন পুরনো দিনের স্মৃতির মতো দানাদার, উষ্ণ। রাতের বেলা জঙ্গলে আগুনের আঁকাবাঁকা রেখা যখন দূর থেকে দেখা যায়, মনে হয় যেন পাহাড়ের গা বেয়ে নামা লাভার সৌন্দর্য আর ধ্বংসের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।

এ সিনেমার গতি ধীর ও গল্প রূপকনির্ভর। পরিচালক রাম রেড্ডি সিনেমায় সব প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দেননি। উড়ন্ত মানুষ, পৌরাণিক গল্প আর জোনাকি পোকার উপস্থিতি অদ্ভুত এক পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে। এ সৌন্দর্যের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা, শ্রেণীবিভাগ ও প্রকৃতির ওপর মানুষের দখলের সমালোচনা। গল্পে লজিক বা লিনিয়ার প্লটের চেয়ে বেশি কাজ করে একটি অন্ধকার রূপকথা। গাছে রহস্যময় আগুন মূলত প্রকৃতির প্রতিশোধ, যা বুঝিয়ে দেয় সীমানা কেটে প্রকৃতিকে দখল করা যায় না। প্রশ্ন করে অতীতের অপরাধবোধ আর ক্ষমতার এক ভঙ্গুর কাঠামোকেও।

প্রকৃতি এক জীবন্ত শক্তি। জোনাকি (জুগনু) ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। একটি জোনাকি দুর্বল হলেও হাজার হাজার জোনাকি অন্ধকারকে আলোকিত করে। জুগনুমা এক রূপকথার ছাই ও আগুন, যা প্রশ্ন করতে বারণ করে। শুধু ভাবায় হয়তো তারা আসলে সাধারণ মানুষ ছিল না; ছিল জোনাকি কিংবা দেবদূত, যারা পৃথিবীতে এসেছিল। কাজ শেষ হওয়ায় তারা আবার ফিরে গেল অন্য কোথাও।

সব মিলিয়ে জুগনুমাকে নিছক একটি সিনেমা বললে বোধহয় সুবিচার হয় না। জুগনুমা রুপালি পর্দার এক বিষণ্ন সুন্দর কবিতা।