সাধারণত শীত মৌসুমে দেশে সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজন বেশি হয়। এসব কারণে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির চাহিদাও থাকে বেশি। তবে এ বছর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় এসবের চাহিদাও অনেকটা কমেছে। যার কারণে দাম কমে টানা লোকসানে রয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
তারা বলছেন, শীতে সবজির উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার কারণে ডিম ও মুরগির দাম কিছুটা কম থাকে। তবে চাহিদা বেশি হওয়ায় খুব একটা লোকসান হয় না। বরং বাড়তি বিক্রির কারণে লাভের ধারায় থাকেন খামার মালিকরা। তবে এ বছর শীতকেন্দ্রিক উৎসব বা অনুষ্ঠানের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। চাহিদা কমায় বিশেষ করে ফার্মের সাদা ও লাল ডিমের দাম কমে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। কয়েক মাস আগেও প্রতিটি ডিমের পাইকারি দাম ১২ টাকার কাছাকাছি ছিল। এখন সেই ডিমের দাম প্রতিটি ৭.৬০-৭.৮০ টাকায় নেমে গেছে। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে এক-দেড় টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ায় খামারিরা দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছেন।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা গত দুই মাসে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ডিম ও মুরগির দামের বড় পার্থক্য থাকায় অনেক খামার মালিক নিয়মিত পোলট্রি খাদ্যও কিনতে পারছেন না। এরই মধ্যে ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনকারী ৪০ শতাংশের মতো খামার বন্ধ হয়ে গেছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় খামার বন্ধের পরও ব্রয়লার মুরগির দাম স্থিতিশীল হচ্ছে না।’
একই অবস্থা ডিমের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খামার মালিকদের প্রায় ৯ টাকা বা এর কিছু কম খরচ হয়। কিন্তু বর্তমানে ডিমের দাম কমে সাড়ে ৭ টাকায় নেমেছে। চাহিদা কম থাকায় আগামীতেও দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে লোকসানের আশঙ্কা থাকলেও লেয়ার মুরগি খামার বন্ধ করে দেয়ার সুযোগ নেই। ডিম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এ খামারে লোকসান হলেও ১৮ মাস কিংবা তিন বছর উৎপাদন ধরে রাখতে হবে। এজন্য বাধ্য হয়ে লোকসান হলেও উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে খামারিদের। মূলত এ বছর সবজির দাম শীতের শুরুতেই সবচেয়ে বেশি কমে গেছে। ভোক্তাদের মধ্যে ডিম কিংবা মুরগির পরিবর্তে সবজির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বেশি। এ কারণে অনুষ্ঠান, উৎসব, হোটেল-মোটেলের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়েও ডিম ও ব্রয়লার মুরগির চাহিদা কমছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
জানা গেছে, ডিম ও মুরগির দাম কমলেও পোলট্রি খাদ্যের দাম আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। যেকোনো পণ্যের চাহিদা কমে গেলে দামও ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাম সমন্বয় হয়নি। এ কারণে উৎপাদিত ডিম ও ব্রয়লার মুরগিতে লোকসান হলেও উৎপাদন খরচ আগের মতোই স্থির রয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশে পোলট্রি খাতের খাদ্য উৎপাদন করায় প্রতিযোগিতাহীনতার কারণে দাম সমন্বয় হচ্ছে না বলে অভিযোগ খামার মালিকদের।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ব্রয়লার ও লেয়ার খামার মালিক শুভাশীষ ভট্টাচার্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি পিস ডিমের দাম মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৮ টাকা ৩০ পয়সা। পাইকারি ব্যবসায়ীদের এ দামের ওপর ৫০-৬০ পয়সা কমিশন দিতে হয়। এ দামে ডিম বিক্রি করলে ১ টাকারও বেশি লোকসান হয়। লেয়ার কিংবা ব্রয়লার খামারে মৌসুমভিত্তিক মন্দা ভাব থাকে। কিন্তু এবারের মন্দা প্রায় দুই মাসব্যাপী হওয়ায় লোকসানের চাপে খামার বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। ডিমের দাম এভাবে কমতে থাকলে পোলট্রি খাতের অনেক উদ্যোক্তা মূলধন হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার খুচরা পর্যায়ে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ৩৬ টাকায়। অক্টোবরেও ফার্মের ডিম ছিল প্রতি হালি ৪৫ টাকা। খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ৯ টাকায় নেমে আসায় খামার পর্যায়ে বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে। এ প্রতিযোগিতায় প্রতিদিনই ডিমের দাম কমছে। আবার মঙ্গলবার প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ১৫০ টাকায়। যদিও খামার পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৫-১৩০ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি মুরগি উৎপাদনে ১৪০-১৫০ টাকা খরচ হলেও কম দামে বিক্রির কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন খামারিরা।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি খামারের উদ্যোক্তা কাজী আমিন মাসুম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোলট্রি খাদ্যের দামের সঙ্গে মুরগি ও ডিম উৎপাদনের কোনো সামঞ্জস্য নেই। সরকারিভাবে উৎপাদিত পোলট্রি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাপ দেয়া হচ্ছে। এখন দাম কমতে কমতে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে রয়েছেন উদ্যোক্তারা। মূলত বড় খামার মালিক ও কোম্পানিগুলো নিজস্ব পোলট্রি খাদ্যসহ আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদনের কারণে লাভে থাকলেও সাধারণ উদ্যোক্তারা বড় ধরনের লোকসানে পড়ছেন।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে একান্ত প্রয়োজন না হলে কেউই বাড়তি অনুষ্ঠান, বেড়ানো কিংবা উৎসবে অংশ নিচ্ছেন না। একই কারণে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পোলট্রি খামারগুলোতে বিনিয়োগ শুরু হয়। শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব হয় না। এ কারণে এখন লোকসান হলেও মুরগি বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত খামার চালু রাখতে হচ্ছে। একইভাবে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত খামারে লেয়ার মুরগির ডিম তুলতে হবে। লোকসান হলেও বাধ্য হয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।









