দলীয় প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’র দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কিন্তু প্রতীক তালিকায় ‘শাপলা’ না থাকায় তা দেয়া যাবে না—এমনটা বলে আসছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে গতকাল কমিশনের প্রকাশ করা প্রতীক তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত না জানা গেলেও বিক্ষিপ্তভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপি নেতারা।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধন করে গতকাল ইসি সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রতীকের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে শাপলা কলিসহ বেশকিছু প্রতীক সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১১৫টি প্রতীক সংরক্ষণ করে সর্বশেষ জারি করা প্রজ্ঞাপনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক ছিল না।

এদিকে কয়েক মাস আগে নিবন্ধন পাওয়ার পর থেকে শাপলা প্রতীক বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছিলেন এনসিপির নেতারা। তবে বরাবরই এ বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে আসছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ ইসির কর্মকর্তারা।

গতকাল সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে শাপলা প্রতীক প্রশ্নে এনসিপি আপসহীন বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নতুন গেজেটে আমাদের “‍শাপলা কলি” প্রতীক দিয়েছে। কমিশন এটি কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে “‍শাপলা” প্রশ্নে আমরা আপসহীন। কমিশনকে শাপলা সম্পৃক্ত করে নতুন গেজেট দিতে হবে। আমরা শান্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। অন্যথায় কমিশন কার্যালয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে তা আদায় করে নেব।’

এ সময় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘কোনো ধরনের আইনি কারণ ছাড়া আমাদের “‍শাপলা কলি” দিয়ে গেজেট দিয়েছে ইসি। তারা বুঝিয়েছে আমরা বাচ্চাদের দল। যেমনটি বড় দলগুলো আমাদের মূল্যায়ন করে থাকে। এটি এক ধরনের বৈষম্য।’

কমিশনের নিজস্ব বিবেচনায় প্রতীক তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শাপলা আর শাপলা কলি এক নয়। এটা ব্যাখ্যার বিষয় নয়, দেখলেই বোঝা যায়। এনসিপি “‍শাপলা” চেয়েছে, আমরা “‍শাপলা কলি” যুক্ত করেছি। এটা কোনো দলের দাবির ভিত্তিতে নয়, কমিশনের নিজস্ব বিবেচনায় করা হয়েছে।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো রাজনৈতিক দলের দাবির প্রতীক নয়। কমিশন মনে করেছে “‍শাপলা কলি” রাখা যেতে পারে, তাই রাখা হয়েছে। আমরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করি। প্রতীক তালিকা কোনো স্থির বিষয় নয়—প্রয়োজনে সংশোধন করা হয়, ভবিষ্যতেও হতে পারে।’

এদিকে, প্রতীক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের একক সিদ্ধান্তের বিষয়ে গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এনসিপি দলীয়ভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সুপ্রিম কোর্টের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দেয়া “‍শাপলা কলি” প্রতীকের বিষয়ে দল এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিষয়টি বিবেচনাধীন রেখেছি। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানানো হবে।’

নির্বাচন কমিশন জন-আকাঙ্ক্ষাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শাপলা প্রতীকের বিষয়ে যে জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল, কমিশন সেই আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারেনি; ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মূলত নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিল না। তাছাড়া কমিশনের ইগো (আত্ম-অহংকার) এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে।’

এ বিষয়ে দলটির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন প্রতীক তালিকায় নতুন করে “‍শাপলা কলি” যুক্ত করেছেন। আমাদের “‍শাপলা’ প্রতীক চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই তালিকায় “‍শাপলা কলি” যুক্ত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, “‍শাপলা কলি” প্রতীক তালিকায় যুক্ত করা গেলে “‍শাপলা” কেন যাবে না? কার স্বার্থে, কার নির্দেশনায় এ হাস্যকর ও অযৌক্তিক কাজ করা হলো? শাপলা আমাদের ন্যায্য পাওনা!’ তবে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে আলোচনা করে জানাবেন বলে তিনি জানান।

এর আগে ইসির প্রতীক তালিকায় ১১৫টি প্রতীক ছিল। সর্বশেষ সংশোধনে ১৬টি প্রতীক বাদ দিয়ে নতুন করে ২০টি প্রতীক যুক্ত করা হয়েছে। এখন তালিকায় মোট প্রতীক দাঁড়িয়েছে ১১৯টিতে।

এ প্রসঙ্গে সচিব জানান, কিছু প্রতীক নিয়ে বিরূপ মন্তব্য এসেছে। কমিশন মনে করেছে, কিছু বাদ দিয়ে নতুন কিছু প্রতীক যুক্ত করা যেতে পারে। সেই বিবেচনায় সংশোধন করা হয়েছে।