বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, মানবিক কার্যক্রম ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক শান্তি উদ্যোগে ঢাকার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে দেশটি।

গতকাল সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এ বিষয়ে এসব কথা বলেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এতে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেয়া হয়নি। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতা পাঠ করেন।

হাকান ফিদান বৃহস্পতিবার রাতে তিনদিনের বাংলাদেশ সফরে ঢাকায় আসেন। তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তার সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া মধ্যাহ্নভোজ শেষে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে দুপুরে কক্সবাজার যান। আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

গতকাল দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর তুরস্ক ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। এর আওতায় উভয় দেশ ইউনেস্কোর ১৯৭০ সালের কনভেনশনের আলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি, রফতানি ও মালিকানা হস্তান্তর প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে।

গত মার্চে আঙ্কারায় বৈঠকের তিন মাসের মাথায় ঢাকায় বৈঠকে বসলেন খলিলুর রহমান ও হাকান ফিদান। শুরুতে প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনায় বসেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একান্তে প্রায় ৩০ মিনিট কথা বলেন। বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি না থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থ একা চলা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এ নীতির মূল কথা। বাংলাদেশ বন্ধু ও অংশীদার চায়, কোনো প্রভু নয়। তিনি জানান, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শুধু তুরস্কের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব দেয়া হয়।

হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরো গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরো শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।’

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো খুঁজে দেখছেন বলে জানান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে, আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।’

বৈঠকে দুই দেশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলোতে অভিন্ন অবস্থান ও সহযোগিতা আরো জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান হাকান ফিদান।

পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও তুরস্কের আধুনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

খলিলুর রহমান জানান, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশী তুরস্কে বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।

রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমরা তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলকভাবে নিজের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের সমর্থনও অব্যাহত রাখব।’

হাকান ফিদান বলেন, ‘ইরানের যুদ্ধ আমাদের অঞ্চলের বাইরেও সমগ্র বিশ্বকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এ প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় অর্জিত অগ্রগতিকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি, এ আলোচনা বাস্তব ফলাফল বয়ে আনবে এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করবে।’

আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ-পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গেই নয়, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ অব্যাহত রাখছি। এ প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করার জন্য পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে আমরা অত্যন্ত মূল্য দিই এবং সক্রিয়ভাবে সেই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য যৌথ অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে হবে।’

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গতকাল বিকালে তিনি উখিয়ার বালুখালী এলাকার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। দুপুরে ঢাকা থেকে বিমানযোগে কক্সবাজারে পৌঁছান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

বিকাল ৪টায় তারা উখিয়ার বালুখালী ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। সেখানে তুরস্কের সহায়তায় স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোহিঙ্গা রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা ১৬ ও ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন। এসব ক্যাম্পে অবস্থিত তুরস্কের নির্মিত ফিল্ড হাসপাতাল এবং স্কুলের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন।