ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু ও সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। গতকাল রাতে দলটির স্থায়ী কমিটির এক জরুরি সভায় এ উদ্বেগ জানানো হয়। সভায় বলা হয়, ওসমান হাদির মৃত্যু একটি কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড এবং এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে দেশকে নৈরাজ্যের পথে ঠেলে দিতে চায়। এ গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিতের ষড়যন্ত্র করছে।’

লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকটি রাত পৌনে ৯টায় শুরু হয়ে রাত ১০টার দিকে শেষ হয়। পরে দলটির মহাসচিব বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদতবরণ করেন। এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানাচ্ছি। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওইদিন গভীর রাতে দৈনিক প্রথম আলো, ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি অগ্নিসংযোগ করে। এতে কর্মরত সাংবাদিকদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই আন্দোলনসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সাহসী ব্যক্তিত্ব, দেশবরেণ্য সাংবাদিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ছায়ানটসহ আরো কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। উদীচীতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।’

সাম্প্রতিক আরো বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কথাও তুলে ধরা হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বৃহস্পতিবার খুলনায় ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের ভবনে হামলা চালানো হয়েছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আবার অগ্নিসংযোগ করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। উত্তরা এলাকায় ৩২টি দোকান ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে আওয়ামী লীগের এক নেতার বাড়িতে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হলো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে এক হিন্দু যুবককে গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা এবং আগুন দেয়া। চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রাজশাহীতেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাংচুর চালানো হয়েছে।’

ঘটনাগুলোকে ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এসব ঘটনা প্রমাণ করে, পুরনো একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নস্যাৎ করে দেশে ফ্যাসিবাদের একটি নতুন সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’

এসব ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘জনগণ মনে করছে, সরকারের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। তাদের নাকের ডগাতেই এসব ঘটনা ঘটছে। এর ফলে দেশ-বিদেশে সরকারের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

হাদি হত্যার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। এরপরও এ ধরনের সহিংস হামলা জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করার গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করে বিএনপি। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাই দলটির মহাসচিব বলেন, ‘শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমরা এ ষড়যন্ত্রকারীদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই—এত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশকে ধ্বংস করতে দেয়া যায় না। এ অপশক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।