খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ঈদকে ঘিরে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদেরও বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের অন্যতম চাল উৎপাদনকারী জেলা কুষ্টিয়া ও নওগাঁয়ও মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কুষ্টিয়ার মিলারদের মতে, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বোরো মৌসুমেও চালের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা। আবার নওগাঁর মিলাররা বলছেন, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ধানের দাম বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে, যার ফলে মিল পর্যায়েও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে চালের দাম বাড়ার বিষয়টি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সংস্থাটির গতকালের প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাইজাম ও আটাশ জাতের মাঝারিমানের চালের দাম প্রতি কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৫৪ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে একই চালের দাম ছিল ৫২ থেকে ৬৮ টাকা। স্বর্ণা ও চায়না ইরির মতো মোটা চালের দামও কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে এ চাল ৪৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকালের বাজারে বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানে চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এ বিষয়ে জনপ্রিয় রাইস এজেন্সির ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদের পর এখনো বাজার পুরোপুরি জমেনি। ঈদের আগে যে চাল এনেছি, সেগুলো এখনো রয়েছে। মিলাররা দাম বাড়ালে তখন আমাদেরও বাড়াতে হয়।’
কারওয়ান বাজারের চেয়ে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় চালের দাম আরো বেশি বেড়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়। ভাটারার নতুনবাজার এলাকার এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের কারণে ঢাকায় চাল সরবরাহ কমেছে। সে জন্য তাকে আড়ত থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তাই খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদন কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগরে সপ্তাহের ব্যবধানে চিকন চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১ থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত। তবে মোটা ও মাঝারি চালের দাম বাড়েনি এখনো।
কুষ্টিয়ার মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, তীব্র গরমের কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় চাল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়েছে দামেও।
খাজানগরের বিভিন্ন চালকল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মিনিকেট, নাজিরশাইলসহ বিভিন্ন ধরনের চিকন চালের উৎপাদন কমে গেছে। দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ধান শুকানো ও চাল প্রক্রিয়াকরণের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চাল উৎপাদনকারীরা আরো জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
কুষ্টিয়ার দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে। তখন বাজারে চালের দামও স্থিতিশীল হয়ে আসবে।’
চাল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ আরেক জেলা নওগাঁয় এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে মানভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। শহরের পার নওগাঁ মহল্লার আড়তদারপট্টিতে গতকাল প্রতি কেজি স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ৪৭-৪৮ টাকা, জিরাশাইল ৬৬-৬৮ ও সম্পা কাটারী ৬৮-৭০ টাকা দরে কেনাবেচা হয়। গত সপ্তাহে স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ৪৫-৪৬ টাকা, জিরাশাইল ৬৫-৬৬ টাকা ও সম্পা কাটারী কেনাবেচা হয়েছিল ৬৭-৬৮ টাকা দরে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে মোটা ধান কিনছে। খাদ্য গুদামের সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার পর হুট করেই বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। কৃষকরাও ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন। এর প্রভাবে চাল উৎপাদনে মিলারদের খরচ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই চালের দাম ১-২ টাকা বেড়েছে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছেন কুষ্টিয়া ও নওগাঁ প্রতিনিধি










