স্ক্যাবিস হলো একটি সংক্রামক ত্বকের রোগ, যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাইটের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে ত্বকে প্রবেশ করে। ফলে তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ি হয়। এটি সাধারণত কবজি, কনুই, কোমর ও আঙুলের মধ্যবর্তী অংশগুলোকে প্রভাবিত করে। চট্টগ্রামে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এ রোগ। চট্টগ্রামের বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে আসা ৬ লাখ ৩০ হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার জন স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। আক্রান্তের হার ২০২১ সালে ৪৩ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ শতাংশে। এ পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

তারা বলছেন, ছোঁয়াচে এ রোগ সম্পর্কে অবগত না হওয়া, সাধারণ রোগ ভেবে ভুল করা এবং অর্ধেক চিকিৎসায় থেমে যাওয়ায় এর প্রকোপ বেড়েছে। রোগটি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রামের বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৮ জন চিকিৎসা নিয়েছে। যাদের মধ্যে স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৫৩ জন। অর্থাৎ মোট রোগীর মধ্যে ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত।

অন্যদিকে গত পাঁচ বছরে মোট চিকিৎসা নিয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৪৭ জন পুরুষ রোগী, যাদের মধ্যে স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬০২ জন। অর্থাৎ মোট পুরুষ রোগীর মধ্যে ৬৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। একই সময় চিকিৎসা নিয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৬ জন নারী, যাদের মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৪৫ জন বা ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। এ সময় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৪৫টি শিশুর মধ্যে ৯২ হাজার ৫০৬ জন স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।

আক্রান্তের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৪৩ হাজার ৩৭৬ জন স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৭৩৪ জন নারী, ১৬ হাজার ৫৬৬ পুরুষ ও শিশু (১২ বছরের নিচে) আক্রান্ত হয় ৮ হাজার ৭৬। ২০২২ সালে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২৪ হাজার ৩৯৩ জন, নারী ২৩ হাজার ৯০ ও শিশু ১০ হাজার ৩৯৯ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ৮৮২ জনে। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয় ৯৩ হাজার ৯৮৯। এর মধ্যে পুরুষ ৪১ হাজার ৭৪, নারী ৩০ হাজার ৯৯৮ জন ও শিশু ২১ হাজার ৯১৭। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৯ জনে। এর মধ্যে নারী ৫৩ হাজার ৫৪২, পুরুষ ৪৮ হাজার ৮১৪ ও শিশু ৩২ হাজার ৬০৩। সর্বশেষ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৯২ হাজার ৪৪৭ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ৩৭ হাজার ৭৫৫, নারী ৩৫ হাজার ১৮১ ও শিশু আক্রান্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৫১১ জন।

কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ভারপ্রাপ্ত) ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান রাহাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশু থেকে শুরু করে নারী ও পুরুষ যারাই চিকিৎসা নিতে আসছেন, তাদের বেশির ভাগই স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। শীতকালে এ রোগ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই রোগটি সম্পর্কে অবগত নয়। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা শুরুতে চিকিৎসা নিতে আসে না, ফলে রোগটি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরাও সংক্রমিত হয়ে পড়ে। স্ক্যাবিস হলে সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হয়। সঠিকভাবে চিকিৎসা না নিলে সামনে বড় শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। বাইরে রোগটি ছড়িয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। স্ক্যাবিসের সংক্রমণচক্র নষ্ট করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। প্রাথমিকভাবে মলম ও কিছু ওষুধ নিয়ম মেনে ব্যবহার করা গেলে স্ক্যাবিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’

স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে শরীরের নিচের অংশে ফুসকুড়ির মতো ওঠে। পরে হাতের আঙুলে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সেটা বাড়তে থাকে। ফুসকুড়ির মতো ওঠার পর সেখানে প্রচণ্ড ব্যথাও শুরু হয়। পরে সেখান থেকে আঁঠালো পানির মতো বের হতে শুরু করলে রোগটি স্ক্যাবিস বলে শনাক্ত হয়। রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ায় মানুষের সংস্পর্শে না যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে। নিয়মমতো ওষুধ ও মলম ব্যবহার করে এখন আমি সুস্থ।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, স্ক্যাবিস একটি পরজীবী রোগ, যা ক্ষুদ্র মাইট দ্বারা সৃষ্টি হয়। এসব মাইট দ্রুত ত্বকের নিচে প্রবেশ করে এবং ডিম পাড়ে। ফলে শরীরে তীব্র চুলকানি ও ফুসকুড়ি হয়। মাত্র ৩-১০ দিনের মধ্যে রোগটি শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্ক্যাবিস ত্বকের ঘা, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যার মতো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত গ্রীষ্মপ্রধান এলাকায় এ রোগ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। স্ক্যাবিসের প্রাদুর্ভাব কিডনি রোগের জন্য প্রধান ঝুঁকির কারণ এবং বাতজ্বর ও বাতজনিত হৃদরোগ হতে পারে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. জুনায়েদ মাহমুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরুতে শরীরের ভাঁজে ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠে এবং তীব্র চুলকানি হয়, যা রাতে বেশি বেড়ে যায়। পরে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং যৌনাঙ্গেও দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে মুখ-মাথাসহ পুরো শরীরে সংক্রমণ হতে পারে। চিকিৎসা না নিলে শিশুদের কিডনিতে অ্যাকিউট গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস হয়ে প্রস্রাব কমে যাওয়া, মুখ ফুলে যাওয়া এবং শরীরে পানি জমার ঝুঁকি থাকে। মূলত ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় রোগটি বেশি ছড়ায়। সেজন্য দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি।’