ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। এর ফলে নৃশংস ঘটনাটির ১৯ দিনের মাথায় এবং ছয় কার্যদিবসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করলেন বিচারিক আদালত।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসামি সোহেলকে ৫ লাখ ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। এ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাবে ভিকটিমের আইনগত উত্তরাধিকার। তা না দিলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় দ্রুত আসামি শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ কথা জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং দোষী ব্যক্তিরা প্রচলিত আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি পাবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একই ধরনের পেশাদারত্ব ও নিষ্ঠা বজায় রাখার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।

এদিকে মামলার রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত পরিষ্কারভাবে বলেছেন অটোপসি রিপোর্টে চিকিৎসক বলেছেন ভিকটিম রামিসার দেহে ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। ট্রাইব্যুনাল অতি দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘রায়ের শুরুতে আদালত বলেছেন, শিশুদের অধিকার বা শিশুদের রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর একটি। অপরাধ হলে কোনো দয়াদাক্ষিণ্য না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তারই নিমিত্তে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।’

রায়কে ঘিরে পুরো আদালত এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে সকালে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য গতকাল দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজের কক্ষে নিয়ে যায়।

সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ভবনের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে আসামির বাসায় প্রবেশ করেন। সেখানে তারা শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পান।

এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয় ঘাতক সোহেল রানাকে।

এ ঘটনায় পরদিন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আসামি করা হয়।

আসামি সোহেল রানা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদের আদালতে দায় স্বীকার করে ২০ মে জবানবন্দি দেয়। একই দিন আদালত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

তদন্ত শেষে ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। একই দিনে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চার্জশিট আমলে নেন। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ১ জুন। মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

নৃশংস এ হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনার পর দেশজুড়ে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারেরও দাবি জানায়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শিশুটির বাসায় যান। ওই পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন।