আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী পরিবেশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আধুনিক প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের লক্ষ্যে আচরণবিধিমালায় বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ সংশোধন আনা হয়েছে। গতকাল ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ গেজেট প্রকাশ করা হয়।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া অপচনশীল দ্রব্য (যেমন রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোনো উপাদানে তৈরি কোনো প্রচারপত্র, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ব্যানার) ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনে পলিথিনের আবরণ এবং প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি মূল শব্দ, দায়িত্ব, প্রক্রিয়া ও কর্তৃত্বের সংজ্ঞা হালনাগাদ করা হয়েছে। ‘ভোট’, ‘ভোটকেন্দ্র’, ‘রিটার্নিং অফিসার’, ‘সহকারী রিটার্নিং অফিসার’, ‘সংসদীয় এলাকা’, ‘ব্যালট বক্স’ ও ‘প্রচারণাপ্রক্রিয়া’সহ নির্বাচনের মৌলিক পরিভাষাগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের জন্য এসব সংজ্ঞা স্পষ্ট নির্দেশনা তৈরি করবে।

নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিমালায় কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে। ড্রোন কিংবা কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ, প্রচারণা বা লাইভ স্ট্রিমিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভোট কেন্দ্র বা তার আশপাশে অস্ত্র, বিস্ফোরক বা ফায়ার আর্মস বহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে গেজেটে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। নিরাপত্তা তদারকির অংশ হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, টাস্কফোর্স ও বিভিন্ন মনিটরিং টিমের দায়িত্ব পুনর্গঠন করা হয়েছে।

ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে আচরণবিধিমালায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এআই জেনারেটেড কনটেন্ট, ডিপফেক ভিডিও-অডিও, বিকৃত গ্রাফিকস, চরিত্র হননমূলক ডিজিটাল প্রচারণা ও উৎস গোপন করে পরিচালিত অনলাইন ক্যাম্পেইনকে সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ভিন্ন প্রার্থীকে হেয় করতে ম্যানিপুলেটেড কনটেন্ট ব্যবহার কিংবা বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

মনোনয়ন যাচাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে সম্পদ বিবরণী, কর সনদ, শিক্ষাগত তথ্য ও ব্যক্তিগত বিবরণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অধিকতর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোনো তথ্য গোপন বা অসত্য প্রমাণ হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্যানার ও পোস্টার ছাড়াও প্রচারণা কেন্দ্র, মাইকিং, শোভাযাত্রা ও জনসভা আয়োজনের সময়সীমা ও সীমাবদ্ধতা আরো কঠোর করা হয়েছে যাতে নির্বাচনী এলাকায় শৃঙ্খলা ও সমতা বজায় থাকে।

গেজেটে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী প্রচারণায় কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। নির্বাচন সম্পর্কিত কাজ ছাড়া প্রশাসনিক সম্পদ ব্যবহারের চেষ্টা করলে তা আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।

ইসি সূত্র জানায়, প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনের বাস্তবতায় আচরণবিধি হালনাগাদ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। অতীতের নির্বাচনে ভুয়া তথ্য, ডিজিটাল অপপ্রচার এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। নতুনভাবে হালনাগাদ করা সংজ্ঞা ও বিধান মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করবে এবং বিভ্রান্তি কমাবে বলে কমিশন আশা করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ আধুনিক প্রযুক্তি নির্বাচনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলেও এর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। তাই আচরণবিধির সংশোধন নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাশীল করতে ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।