নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে বাণিজ্যিক ভবনে বিস্ফোরণের পর ধসে পড়া অংশের চাপায় আওলাদ হোসেন (৪০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১২ জন। নগরীর আরকে দাস রোডের ডালপট্টি এলাকায় গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর কিছুক্ষণ পরই শত বছরের পুরনো ভবনটির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ধসে পড়ে। এতে আশপাশ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজার নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ। ওই এলাকার আরকে দাস রোডে ইলিয়াস দেওয়ানের মালিকানাধীন দোতলা ভবনের একতলায় রয়েছে আটটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ভবনের দক্ষিণ অংশের ভাড়াটিয়া গরিবে নেওয়াজ সল্টের মালিক জামাল দেওয়ান জানান, রোজার আগের দিনগুলোয় বেচাকেনা বেশি হওয়ায় তিনিসহ প্রায় সব ব্যবসায়ী একটু আগেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চলে আসেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় ভবনের উত্তর অংশের ভাড়াটিয়া রাজলক্ষ্মী ভাণ্ডারের মালিক রাজন দোকান খুলে পূজার জন্য আগরবাতি জ্বালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তার কক্ষে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। তাতে ভবনে আগুন ধরে যায়। এলাকাবাসী দ্রুত রাজনকে উদ্ধার করে বাইরে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে অংশটি ধসে পড়ে। ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন লোড-আনলোড শ্রমিক এতে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তিনি আরো জানান, ভবনটি অনেক বছরের পুরনো। রাজলক্ষ্মী ভাণ্ডার নামে ওই দোকানের নিচ দিয়ে গ্যাস ও সুয়ারেজ লাইন আছে। প্রায়ই পাইপ লিকেজ হয়ে দোকানে গ্যাস ঢুকত। এর আগেও একবার ভবনটিতে আগুন লেগেছিল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনসুর মিয়া জানান, বিকট শব্দে হঠাৎ করেই বিস্ফোরণ হয়। এ সময় প্রায় ৫০ গজ দূরে এক ট্রাকচালক ও তার হেলপার দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিস্ফোরণের ফলে ভবনের পলেস্তারা ছিটকে গিয়ে তারা আহত হন।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক ফকর উদ্দিন আহমেদ জানান, বিস্ফোরণে ভবনে আগুনে ধরে যায়। তাদের ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে ১ ঘণ্টার চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ভবনের ভেতরে গ্যাসের পাইপ আছে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্তের পর নিশ্চিত করে বলা যাবে।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আরএমও ডা. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘ভবনে বিস্ফোরণ ও ধসে পড়ার ঘটনায় আহত নয়জন আমাদের হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। তারা হলেন আওলাদ হোসেন, জগদীশ চন্দ্র, মোহাম্মদ হোসেন, রবীন্দ্র দত্ত, রেজাউল করিম, জাহাঙ্গীর হোসেন, শান্ত, রিজন ও মামুন। প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।’ এর বাইরে হজরত, সরদার ও সেন্টু নামে আরো তিনজন আহত হয়েছেন বলে ফায়ার সার্ভিসের তালিকা থেকে জানা যায়।

কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসি আনিচুর রহমান বলেন, ‘আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেয়ার পর আওলাদ হোসেন মারা যান। তিনি একজন লোড-আনলোড শ্রমিক ছিলেন। তবে তার বিস্তারিত ঠিকানা এখনো জানা যায়নি।’

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস জানান, সিটি করপোরেশন বেশ কয়েক বছর আগেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটির মালিক ইলিয়াস দেওয়ান ঢাকার বনানীতে থাকেন। ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য তাকে তিনবার চিঠিও দেয়া হয়। কিন্তু তিনি তা করেননি। এ ভবনে আগেও একবার একইভাবে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিজেরা না ভাঙলে সরকারিভাবে ভেঙে দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এজন্য জেলা প্রশাসন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও পিডব্লিউডির সমন্বয়ে একটি কমিটিও রয়েছে। তারা কেন ভবনটি ভাঙার উদ্যোগ নিল না এমন প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ তাত্ক্ষণিক কথা বলতে রাজি হননি। শুধু বলেছেন, ‘আগামীকাল অফিসে এলে এ ব্যাপারে কথা বলব।’

সিটি করপোরেশনের টাউন প্ল্যানার মাঈনুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েক বছর আগে এ রকম ৪২টি ভবনের তালিকা তৈরি করি। কিন্তু এসব ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা, ভবন মালিকদের অংশীদারত্ব নিয়ে সমস্যাসহ নানা সমস্যা থাকে। এজন্য ভাঙা যায়নি। ভবনটি অবশ্য কী ধরনের সমস্যার কারণে ভাঙা হয়নি তা দেখে বলতে হবে। তবে এখন দু-একদিনের মধ্যেই এটি ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করছি।’

এ বিষয়ে কথা বলতে ইলিয়াস দেওয়ানের সেলফোনে কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।