‘বাঁচার মতো বাঁচতে চাই ৩০০ টাকা মজুরি চাই’, ‘৩০০ টাকা মজুরি দাও, নাইলে বিষ দাও’—এমন সব স্লোগানে গতকালও মুখর ছিল সিলেট ও হবিগঞ্জের রাজপথ। মজুরি বৃদ্ধিসহ সাত দফা দাবিতে টানা ১৩ দিন ধরে ধর্মঘট পালন করছেন চা বাগানের শ্রমিকরা। তাই বহুমুখী সংকটে পড়েছে রফতানি আয় এনে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প। ভরা এ মৌসুমে বাগানেই নষ্ট হচ্ছে চা পাতা। বৈঠকের পর বৈঠক করেও কোনো সমাধান করতে পারছেন না সরকারের প্রতিনিধিরা। উল্টো ঘর ছেড়ে এবার শ্রমিক মা-বাবাদের সঙ্গে আন্দোলনে নেমেছে তাদের স্কুলপড়ুয়া শিশুসন্তানরাও। এদিকে চলমান সংকট নিরসনে আজ ঢাকায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাতিল করা হয়।
সরজমিনে বাগানগুলোতে দেখা গিয়েছে সুনসান নীরবতা। কেবল একটি বাগান ছাড়া গতকাল সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কোনো শ্রমিকই কাজে যোগ দেননি। টানা ১৩ দিন আন্দোলনে থাকায় আয় বন্ধ। অনেকের ঘরে খাবার নেই। অর্থকষ্টে দিনযাপন করছেন তারা। তবু দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজে যোগ না দেয়ার প্রত্যয় তাদের। মঙ্গলবারও চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া, ফুলছড়া, জেরিন ও কালীঘাটেই সবচেয়ে বেশি চা বাগান। গতকাল সেখানকার শ্রমিকরা আন্দোলনে না নামলেও পাতা তুলতে বাগানেও যাননি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ জেলার জেরিন চা বাগানের শ্রমিকরাই কেবল কাজে যোগ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে ন্যায্য মজুরির বিষয়ে ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজারের ৯১টি চা বাগানের শ্রমিক।
এদিকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন করে কাজে যোগ দেয়ার অনুরোধ করা হয়। জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ হাসানের আশ্বাসে মঙ্গলবার ১২টি বাগানের শ্রমিকরা কাজেও ফিরেছিলেন। কিন্তু গতকাল তাদের কেউ পাতা তুলতে যাননি। আবারো একযোগে কর্মবিরতিতে নেমেছেন শ্রমিকরা।
এর আগে ২১ আগস্ট রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে ১২০ টাকা মজুরি রেখেই কাজে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই প্রস্তাব মেনে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। এরপর কিছু বাগানের শ্রমিক কাজে ফেরেন। আবার একাংশ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে প্রতিনিয়তই তাদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে। তাই নেতাদের কথা তারা আর বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, আমরা সরকারপক্ষের সঙ্গে যে আলোচনা করেছি, তা মানতে চান না শ্রমিকরা। আমাদের কথা বুঝতে চান না। শ্রমিকরা এখন আমাদের আওতার বাইরে চলে গিয়েছে। তাই আমাদের আর কিছু করার নেই। এখন যুবক ছেলেরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের আর আটকানো সম্ভব নয়।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজে না ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন হবিগঞ্জের শ্রমিক নেতারাও। গতকালও বাগানে বাগানে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন করে ধর্মঘট পালন করেন সেখানকার শ্রমিকরা। বাংলাদেশ চা-কন্যা নারী সংগঠনের সভাপতি খাইরুন আক্তার বলেন, আমরা সকাল থেকেই আন্দোলনে আছি। বিভিন্ন চা বাগান থেকে শ্রমিকরা আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। ৩০০ টাকা মজুরি না পেলে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।
বাংলাদেশ চা সংসদের সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রমিকরা কাজে না যাওয়ায় মালিকদের প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকরাও আর্থিক কষ্টের মুখে পড়েছেন। তারা কাজে ফিরবেন এটাই আমি প্রত্যাশা করছি।
দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা করার দাবিতে সিলেটসহ সারা দেশের চা শ্রমিকরা ৯ আগস্ট থেকে আন্দোলনে নেমেছেন। এর মধ্যে ১১ আগস্ট পর্যন্ত তারা ২ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন। কিন্তু মালিকদের সাড়া না পেয়ে তারা ১৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেন, যা এখনো চলছে। যদিও শনিবার শ্রীমঙ্গলের শ্রম অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১২০ থেকে ২৫ টাকা মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাতে সাড়া না দিয়ে আগের দাবিতেই অনড় চা শ্রমিকরা। শ্রম অধিদপ্তর শ্রীমঙ্গলের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম জানান, সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়েও এ নিয়ে কাজ চলছে।










