প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি যা শুধু সনদ প্রদান করবে না বরং দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে। জনসংখ্যাকে জন সম্পদে রূপান্তর করবে। শিক্ষা শুধু চাকরিজীবী তৈরি করবে না বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে।’
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আজ সকালে ‘কর্মমুখী শিক্ষা নেব, বিশ্বজুড়ে কাজ করব’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সারা দেশের ১২ হাজার কলেজ শিক্ষককে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর হাতে সম্মাননা স্মারক ও গাছের চারা তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ শুধুমাত্র দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি কিংবা দেশের সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অকার্যকর করে দেয়নি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’
এসময় দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানাতে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দুই হাজারের বেশি কলেজে বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার প্রসারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অটোমেশন এবং এআই-চালিত প্রযুক্তির কারণে অনেক পুরোনো পেশায় কর্মসংস্থান যেমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে কিংবা অবলুপ্ত হয়েছে, একইসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ নতুন নতুন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিগত বিপ্লব মোকাবেলায় সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, ফরেনসিক সায়েন্স, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল যোগাযোগ, নেতৃত্ব, উপস্থাপনা দক্ষতা এবং আর্থিক সাক্ষরতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং পঞ্চম প্রজন্মের বেতার প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ শুরু করেছে। শিক্ষা কারিকুলামের সংস্কারকে তিনি একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন।
শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরির প্রধান নিয়ামক বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা নিয়েও শিক্ষিত শিক্ষার্থীদের অনেককে বেকার থাকতে হয়।’ এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। এ কারণে সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায় বলে জানান।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা জীবনেই বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
ক্যাম্পাস থেকেই উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণার বাণিজ্যিকীকরণের জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ দেওয়া হবে। এতে তরুণরা চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের তরুণদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে হবে।’
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখারও পরামর্শ দেন তিনি।
শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও অঙ্গীকারের ওপর শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।’
শিক্ষকদের শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য রোল মডেল এবং সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় উন্নয়নকে সম্মিলিত প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং শিল্পখাতের সমন্বিত সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রুদ্ধ করতে পারবেনা, ইনশাআল্লাহ।’










