বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের আমলে ২০০১-০৬ মেয়াদে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন ১৯৯৬ সালে। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভাবনা, বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ দলের অবস্থান ও কক্সবাজার জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ছৈয়দ আলম

‎আসন্ন নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন?

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মোড় ও ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। শুধু আমরা না, জনগণও সে চোখেই দেখছে। এ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য সারা দেশের ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

গণভোট প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে বলুন।

স্পষ্ট করে বলি, বিএনপি গণভোটের পক্ষে। জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি জনগণের মাধ্যমে নির্ধারিত হোক, সেটাই আমাদের প্রস্তাব ছিল এবং এখনো সেই অবস্থানেই আমরা আছি। আর ‎নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে জনগণই। পরিবেশ ও মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আশাবাদী। ইনশা আল্লাহ, বিএনপি একটি ভূমিধস বিজয়ের দিকে এগোচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশকে ব্যাহত করছে কী?

এ মুহূর্তে যে ধরনের নির্বাচনী পরিবেশ থাকার কথা, আমার মতে বাংলাদেশে সেই পরিবেশই বিরাজমান রয়েছে। ‎কিছু রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক থাকবেই। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। নির্বাচনী মাঠে তর্ক-বিতর্ক না থাকলে নির্বাচনের আমেজ আসে না। তবে যে যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক চলছে, তার জবাব রাজনৈতিক ভাষায় ও যুক্তির মাধ্যমেই দেয়া উচিত। কোথাও কোথাও এর ব্যতিক্রম ঘটছে, কিন্তু সেটাও অস্বাভাবিক নয়।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া নিয়ে কোনো সংশয় তৈরি করছে কী?

ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে আমরা বুঝি রেজিস্টার্ড সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত ভোটগ্রহণকে। দুই-একটি ছোট দল বাদে প্রায় সব নিবন্ধিত দলই এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। একসময় আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বড় একটি রাজনৈতিক দল ছিল। পরে দলটি একটি মাফিয়া ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোয় রূপ নেয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা গুম, খুন, অপহরণসহ সব ধরনের নৈরাজ্য চালিয়েছে। ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তারপর এ দেশের মানুষ তাদের আর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মানতে রাজি নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে দেশের জনগণ পরিষ্কারভাবে জবাব দিয়েছে, এ দেশে আওয়ামী লীগের সেই রাজনীতি আর চলবে না। জনগণের দাবির মুখে আইন সংশোধন করে তাদের দলীয় নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। যারা স্বৈরাচার ও গণহত্যার জন্য দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলায় রায়ও হয়েছে। ফলে তারা আর রাজনৈতিক শক্তি নয়।

‎বিএনপি প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ও হেলথ কার্ড নিয়ে বলুন।

‎‎আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়েছে, তা আমরা সবাই দেখছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, হেলথ কার্ড—এগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন চিন্তা। আমাদের ইশতাহারে আরো গেম চেঞ্জিং বিষয় থাকবে।

এ ইশতাহার কবে প্রকাশ হবে?

‎‎কয়েকদিনের মধ্যেই ইশতাহার প্রকাশ করা হবে। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ—সব খাতে আমাদের স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকবে।

শিক্ষা, কৃষি, খেলাধুলা, পরিবেশ, জনকল্যাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

শিক্ষায় আমরা বিপ্লবী পরিবর্তন চাই। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে ডিগ্রির পাশাপাশি কর্মদক্ষতাও তৈরি হয়। শিক্ষিত বেকারদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বেকার ভাতার ব্যবস্থাও থাকবে। ‎কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, বীজ, সার, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে এমন ব্যবস্থা নেয়া হবে, যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দরিদ্রদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সরকারি ভর্তুকির আওতায় আনা হবে। ‎খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বাধ্যতামূলক করা হবে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা থাকবে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতার জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া ‎পরিবেশ রক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোসহ নানা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

কক্সবাজার জেলার উন্নয়ন সম্পর্কে আপনাদের ভাবনা বলুন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় অঞ্চল। এখানে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন রয়েছে, তেমনি সামুদ্রিক সম্পদে ভরপুর। দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় হাব হচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল। এটি চিন্তা করেই ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠন করার পর মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। আগামীতে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে গভীর সমুদ্রবন্দরকে পূর্ণতা দেয়া হবে। একটি জনপদের উন্নয়নের চাবিকাঠি হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। বিগত সরকারের সময়ে কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা চরম অবহেলার শিকার হয়েছে। এক্ষেত্রে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ রোডকে আন্তর্জাতিক মানের সড়কে উন্নীত করার বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকবে।