পাটকল আবারো চালু হবে, সে আশায় দিন কাটছে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের। গত বছরের ২ জুলাই খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর গেটে বন্ধের নোটিস টানানো হয়। ৩ জুলাই সকাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় পাটকলগুলো।
যখন বন্ধের নোটিস টানানো হয়, তখনো শ্রমিকরা জানতেন, বেসরকারি উদ্যোগে পাটকলগুলো আবার চালু হবে। আগে কাজ করা শ্রমিকরা সেখানে প্রাধান্য পাবেন। সে আশায় আবাসিক এলাকা ছেড়ে দিলেও খুলনা নগরীর খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন শ্রমিকরা। তবে এক বছরেও পাটকলগুলো চালু না হওয়ায় এখন তারা হতাশ। আদৌ চালু হবে কিনা, সেটি নিয়েও তারা এখন সন্দিহান।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) নেতারা বলছেন, পাটকলগুলো ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইজারা নেয়ার জন্য দরপত্র জমা দিয়েছে। পাটকল চালু হলে স্থানীয় শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পাবেন।
খুলনা অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে খুলনা নগরের খালিশপুরে চারটি ও ভৈরব নদের অন্য পারে দিঘলিয়া উপজেলায় একটি। এছাড়া ফুলতলার আটরা শিল্প এলাকায় দুটি ও যশোরে দুটি। এসব পাটকলে কাজ করতেন প্রায় ৩০ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক। ওই শ্রমিকদের অধিকাংশই এখন বেকার।
সরেজমিনে মঙ্গলবার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুনশান। লোকজনের আনাগোনা নেই। নেই তাঁতের ঠক ঠক শব্দ। নেই কাজ শেষে বাড়ি ফেরার তোড়জোড়। আবাসিক ভবনগুলোও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বেকারত্ব আর মানসিক অশান্তিতে দুর্বিষহ জীবন কাটছে অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের।
শিল্পাঞ্চল খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ হয়ে গেছে বেশ আগে। সর্বশেষ রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলও বন্ধ হওয়ায় এক সময়ের কর্মচঞ্চল খালিশপুর এখন প্রায় বিরানভূমি। বন্ধ পাটকলগুলো কবে চালু হবে তার কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় খালিশপুর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে মানুষ। করোনার কারণে পরিস্থিতি হয়েছে আরো ভয়াবহ। কর্মহীন শ্রমিকদের লকডাউনের দিনগুলো আক্ষরিক অর্থেই অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে। দীর্ঘদিন ধরে আয়-রোজগারহীন এসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও পড়েছে চরম ঝুঁকিতে।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যমতে, খুলনাঞ্চলের নয়টি পাটকলে স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন ১৪ হাজার ৯৮৭ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৪ জন তাদের পাওনা নগদ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা এখনো পাননি। এছাড়া ৯ হাজার ৪৮১ জন শ্রমিক তাদের পাওনা প্রায় ৪৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এখনো পাননি। এছাড়া সাতটি পাটকলের ২১ হাজার ৩৫১ জন বদলি শ্রমিকের পাওনার পরিমাণ ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। কিন্তু বদলি শ্রমিকদের কেউ এখনো কোনো টাকা পাননি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত খালিশপুর জুট মিলের ৪ হাজার ৪৭৪ জন ও দৌলতপুর জুট মিলের ৩৫০ জন শ্রমিক দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন। মিল বন্ধ হওয়ার কারণে তারা কোনো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের সর্বশেষ সিবিএ সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত উদ্দিন আজাদী বলেন, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ছিলেন স্থায়ী শ্রমিক। আর অস্থায়ী (বদলি) শ্রমিক ছিলেন প্রায় ২০ হাজার। এছাড়া ছিলেন কিছু দৈনিক চুক্তির শ্রমিক। করোনাকালে তাদের অবস্থাই বেশি খারাপ।
হেমায়েত বলেন, খারাপ অবস্থা আবাসিক শ্রমিকদেরও। তাদের জন্য গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের টাকা নেয়ার অন্যতম শর্ত ছিল ঘরবাড়ি পুরোপুরি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে কর্তৃপক্ষকে জায়গাটি বুঝিয়ে দিতে হবে।
সে টাকাও বুঝে পাননি তারা। পাটকলগুলো আবার কবে চালু হবে সে আশায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।
প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের সাবেক শ্রমিক শাহিন চৌধুরী বলেন, ৩০ বছরের বেশি সময় পাটকলে চাকরি করেছেন। পাটকল বন্ধ হওয়ার পর পাশেই ঘর ভাড়া করে আছেন। তবে চলতি লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সহযোগিতার।
খুলনা ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক হাফিজুর রহমান বলেন, ৩৫ বছরের চাকরি জীবনের ২০ বছরেরও বেশি সময় এখানে বসবাস করেছি। হ্যান্ডশেকের টাকা পেতে ঘর ভেঙে দিয়েছি। ঘর ভাড়া করে থাকছি। কিন্তু এখনো টাকা পাইনি।
পাটকল শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, পাটকলের কলোনিতে ছোট থেকে বড় হয়েছি। এ জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। পাটকলগুলো চালু হবে সে আশায় এখনো রয়েছি।
পাটকল চালুসহ ১৪ দফা দাবিতে এক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে ‘পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ’
নামের একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের আহ্বায়ক কুদরত-ই-খুদা বলেন, পাটকলগুলোয় প্রচুর সম্পদ রয়েছে। তিনি বলেন, পাটকলগুলো ইজারা বা পিপিপির ভিত্তিতে ছেড়ে দেয়া হলে ওই সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবে।
বিজেএমসির মহাব্যবস্থাপক ও খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়কারী গোলাম রাব্বানী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অনেক দরপত্র জমাও পড়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
তবে বিজেএমসির খুলনা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ১৭টি পাটকল আন্তর্জাতিক টেন্ডার হয়েছে। তার মধ্যে খুলনা অঞ্চলের পাঁচটি পাটকল রয়েছে। ক্রিসেন্ট, ইস্টার্ন, দৌলতপুর, যশোরের কার্পেটিং জুট মিলস ও যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ জানান, যেসব আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। লিজের মাধ্যমে পাটকল আবার চালু করা হবে, সেজন্য আরো সময় লাগবে।









