রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে ‘এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ’ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া এ সিদ্ধান্তে প্রতিটি ট্রেনে ভাড়া বাড়ছে সর্বনিম্ন ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত। রেলের এ সিদ্ধান্তে পূর্বাঞ্চলের ২৭ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে শুধু পাঁচ জোড়া ট্রেন থেকেই ২০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে যা মোট বাড়তি আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ।
রেলের নথিপত্র অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে বর্তমানে ২৯ জোড়ার বেশি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। আগে একাধিক সেতুতে বাড়তি দূরত্ব সংযোজন করা হলেও এবার ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের আরো ১১টি সেতু ও কালভার্টে পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়েছে। এতে ২৭ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন থেকে প্রাক্কলন অনুযায়ী বছরে ৪৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ৪৫৬ টাকা অতিরিক্ত আয় হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
এর মধ্যে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা ও ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটের পাঁচটি ট্রেন থেকেই বাড়তি আয় হবে ২০ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫২ টাকার বেশি, যা মোট অতিরিক্ত আয়ের ৪১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। দীর্ঘ দূরত্ব ও বিরতিহীন সার্ভিসের কারণে এসব রুটের ট্রেন থেকে সর্বাধিক আয় বাড়বে বলে মনে করছে রেলওয়ে। পাঁচটি ট্রেন হলো—ঢাকা–কক্সবাজার রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটের সোনার বাংলা, সুবর্ণ ও চট্টলা এক্সপ্রেস।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ২০১৬ সালের পর থেকে রেলওয়ে যাত্রী খাতে ভাড়া বাড়ায়নি। তবে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে দীর্ঘদিনের পুরনো কিছু রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার এবং সাম্প্রতিক সময়ে পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে ভাড়া আংশিকভাবে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। লোকসানে থাকা রেলওয়েকে গতিশীল গণপরিবহন সংস্থায় পরিণত করতে নতুন উদ্যোগের বিকল্প নেই। আশা করছি, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে আগামী বছর শুধু পূর্বাঞ্চলেই যাত্রী খাত থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত আয়।’
রেলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন নিয়মে ২৭ জোড়া ট্রেনে দৈনিক বাড়তি আয় আসবে ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৯৬৫ টাকা। যার ৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৩৬ টাকাই আসবে সোনার বাংলা, সুবর্ণ, চট্টলা, পর্যটক ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস থেকে। এছাড়া মাসে ৪ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার ৩৮ টাকার মধ্যে এ পাঁচ ট্রেনেই আয় বাড়বে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭২ হাজার ২৮৮ টাকা। দেশের প্রধান দুই নগরী ছাড়াও পর্যটক নগরীর সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সংযোগকারী ট্রেনের কারণে মাত্র পাঁচটি ট্রেনেই সবচেয়ে বেশি আয় বাড়বে বলে মনে করছে রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা। এতে বার্ষিক রেলের আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
রেলের এ আয় বৃদ্ধির প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটের সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেনের হিসাব বিবেচনায় নেয়া হয়নি। মূলত আয় বৃদ্ধির এ হিসাব ট্রেনভিত্তিক যাত্রীচাপ, স্টেশনভিত্তিক ওঠানামা ও বহনযোগ্য লাগেজের গড় পরিমাণ ধরে করা হয়েছে।
রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ বলছে, ২০ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া পদ্ধতিতে সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে বার্ষিক আয় বাড়বে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া সুবর্ণ এক্সপ্রেসে বার্ষিক আয় বাড়বে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা, কক্সবাজার এক্সপ্রেসে ৩ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, পর্যটক এক্সপ্রেসে ৩ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে বার্ষিক আয় বাড়তে পারে ২ কোটি ৮১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। তবে ট্রেনের কোচ সংখ্যা সংযোজন-বিয়োজনের ফলে বাড়তি আয়ের কিছুটা তারতম্য ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।
যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে আয় বাড়াতে নানান সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। যার ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পূর্বাঞ্চলের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়ে গেছে। আয় বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে এখন সেবার মানকেও বাড়ানোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে।’
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৮৭ নং সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের (চট্টগ্রাম-ঢাকা) দৈনিক ৭৮ হাজার ১১৯ টাকা আয় বৃদ্ধি ছাড়াও বছরে বাড়বে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭৩ হাজার ১২৮ টাকা। একইভাবে ৭৮৮ নং সোনার বাংলা (ঢাকা-চট্টগ্রাম) ট্রেনের দৈনিক ৮৮ হাজার ৯১৯ টাকা ও বার্ষিক আয় বাড়বে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৭২৮ টাকা। একক ব্র্যান্ড হিসেবে ২৯ জোড়া ট্রেনের মধ্যে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকার বেশি বাড়তি আয় রেলের রাজস্বে যোগ করবে। তবে ৮১৩/৮১৪ নং কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও ৮১৫/৮১৬ নং পর্যটক এক্সপ্রেসের আয় প্রতিটিতে উভয়মুখে ৩ দশমিক ৯২ কোটি টাকা করে বাড়তি আয়ের প্রাক্কলন করা হলেও পর্যটন মৌসুমে বাড়তি কোচ সংযোজন করা হলে ট্রেন দুটি থেকে আয় আরো বাড়তে পারে বলে আশা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বার্ষিক সবচেয়ে কম আয় বাড়বে উপবন, এগারসিন্ধুর প্রভাতী, এগারসিন্ধুর গোধূলী, জয়ন্তিকা, কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের মতো স্বল্প দূরত্বের ট্রেনে।
প্রসঙ্গত, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১২৪ যাত্রী থেকে বার্ষিক রাজস্ব আয় হয়েছে ৩১ কোটি ৪২ লাখ ১ হাজার ৮২০ টাকা, পর্যটক এক্সপ্রেসে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭০ যাত্রী থেকে আয় হয়েছে ২২ কোটি ৯৫ লাখ ২৪ হাজার ৩৯১ টাকা। অন্যদিকে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৮ যাত্রী থেকে আয় ৩৩ কোটি ৩৬ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ টাকা, সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ২০৭ যাত্রী থেকে আয় ২৪ কোটি ৩২ লাখ ৮৬ হাজার ৩২০ টাকা এবং চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে ৮ লাখ ৭০ হাজার ৮৬ যাত্রী থেকে বার্ষিক রাজস্ব আয় হয়েছে ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৭৩ হাজার ৪১২ টাকা।









