হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে। বিএনপির এ প্রার্থী বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, নির্বাচন ও নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের প্রতি নিজের অঙ্গীকার নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুজিত সাহা

এবারের নির্বাচন কেমন হবে?

আমার নির্বাচনী এলাকা চট্টগ্রাম-৭ আসন তথা রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সবাই মিলে একটি সুন্দর নির্বাচন করার চেষ্টা করছি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোকেও ধন্যবাদ জানাই। এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকেও কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। আশা করি, সবার সহযোগিতা থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারি সুন্দরভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন?

সুন্দর একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে সবাই। গ্রামে-গঞ্জে চায়ের দোকানে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। সবাই নির্বাচনমুখী হয়েছে। আসলে গত দেড় বছর এখানকার মানুষ নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিল। এখন আমরা ঠিকমতো ক্যাম্পেইন করতে পারছি। মাঠে-ঘাটে গিয়ে ক্যাম্পেইন করতে পারছি। গতকালও রাঙ্গুনিয়ায় বিশাল গণমিছিল ছিল। যারা অংশ নিয়েছেন তাদের চেহারায় একটা নতুন হাসি ফুটে উঠেছে। অনেক বছর ধরে তারা অপেক্ষা করেছেন নিজের দলের পক্ষে নির্বাচনের প্রচার চালাবেন। কেউ হামলা করবে না। মামলা দেবে না। এটি শুধু দলীয় কর্মীদের মধ্যে না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল। মনে হচ্ছে বুকের ওপর পাথর চেপে রাখতে হয়েছিল, মত প্রকাশ করা যাচ্ছিল না। এখন মানুষ আবেগ নিয়ে ভোটের মাঠে নেমে এসেছে।

তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে দলের প্রবীণদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ও মাঠপর্যায়ে সমর্থন আদায়কে কি চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে?

নবীন-প্রবীণের মিথষ্ক্রিয়াকে রাজনীতিতে আমি একটা বড় শক্তি হিসেবে দেখি। অনেক জায়গায় যারা নির্বাচন করছেন, তাদের মধ্যে অনেক মুরব্বি আছেন; যাদের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের সঙ্গে সংযোগ রেখে রাজনীতি করতে সমস্যা হয়। কিন্তু আমি এমন একটা বয়সে আছি, যেটি না প্রবীণ; না তরুণ। এ কারণে দুই প্রজন্মের সঙ্গেই কাজ করতে সুবিধা হয়েছে।

তৃণমূলের সিনিয়র নেতারা যারা আছেন, যারা আমার বাবার সঙ্গে রাজনীতি করতেন, তারাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। বাবা হারানোর পরে তো কারো না কারো হাত ধরে রাজনীতি করতে হয়। আমি তাদের হাত ধরেই রাজনীতি করেছি, রাজনীতি শিখেছি। দ্বিতীয় শক্তি হলো তরুণ প্রজন্মের ভাইয়েরা সবসময় পাশে থাকে, সামনে থাকে। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সমন্বয়ে গঠিত ‘টিমওয়ার্ক দ্যাট মেকস ড্রিমওয়ার্ক’।

এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন শিল্প নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

যেসব শিল্প এখানকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করা হবে। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হবে নতুন শিল্প স্থাপন। রাঙ্গুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানকার অবস্থান। আমরা এমন জায়গায় আছি, আমাদের ওপর দিয়ে কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান যাওয়া যায়। এ অবস্থানকে কাজে লাগাতে না পারলে আমরা ব্যর্থ হব। রাঙ্গুনিয়ার সামাজিক শৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে এ উপজেলাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। এখন বেশির ভাগ পর্যটক একদিনের মধ্যে ঘুরে আবার শহরে বা গন্তব্যে ফিরে যান। আমি চাই তারা দিন শেষে রাতেও যেন রাঙ্গুনিয়ায় থাকে। নদী, পাহাড়, সাফারি পার্ককে কেন্দ্র করে ইকো হোটেল, রিসোর্ট তৈরির স্বপ্ন আছে, বাস্তবায়ন করতে চাই। আরেকটা বিষয় আমাদের তরুণরা প্রযুক্তিতে দক্ষ। অনেকে ভিডিও এডিটিং করে, অনলাইনে কাজ করে। এটাকে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আনতে পারি, এখানে ট্রেনিং সেন্টার করে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দিতে পারি তাহলে ঘরে বসেই আয় হবে, কর্মসংস্থান হবে। আইসিটি সেক্টর বড় হয়ে গেছে, এটাকে রাঙ্গুনিয়ায় কাজে লাগাতে চাই।

রাঙ্গুনিয়ার কৃষি ও প্রতিবেশের সুরক্ষায় আপনার পরিকল্পনা কী?

রাঙ্গুনিয়া একসময় দেশের খাদ্যশস্যের বড় উৎস ছিল, এটা আমাদের গর্ব। আমরা গর্ব করে বলতে পারি আমাদের কৃষির ঐতিহ্য আছে। এদের জন্য কিছু না করতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব। এখানকার কৃষি ও প্রতিবেশের সুরক্ষায় আইনের শাসন রাঙ্গুনিয়ায় শক্তভাবে প্রয়োগ করা হবে। খাল, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে টেকসই উন্নয়নে কাজ করব।

রাঙ্গুনিয়ায় দুটি ইকোপার্ক থাকলেও এগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। আপনার মন্তব্য কী?

আমাদের দলের মাস্টার প্ল্যানে খাল খনন ও পরিবেশ আছে। রাঙ্গুনিয়ায় দুটো বড় ইকোপার্ক আছে। এগুলোর জন্য পাহাড়, বনভূমির চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে রাখা। এনজিওর মাধ্যমে অনেক টাকা এসেছে এখানে। আমার সন্দেহ হয় আগের সরকার এসব পার্কের নামে আসা বিদেশী ফান্ডগুলো বিদেশে নিয়ে গেছে। আমি এই ইকোপার্ক দুটোকে প্রকৃতপক্ষেই সাফারি পার্ক বানাতে চাই। দেশের বড় সমস্যা পশু নিপীড়ন। এখানে বন্যপশুর সুরক্ষা ও অভয়াশ্রম বানাতে চাই। এগুলোকে পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনা করা হবে।

এখানকার সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?

আমাদের মূল যোগাযোগ পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রাঙ্গুনিয়ায় চুয়েট-কাপ্তাই রোড বহু বছর সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও হয়নি। এ কারণে কাপ্তাই যেতে তীব্র যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রী ও পর্যটকদের। এটিকে চার লেনে উন্নীত করতে হবে। আমি শুধু স্বপ্ন দেখাব না, করে দেখাব। এটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের মৌলিক দাবিগুলোর একটি। আমার পিতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আমলে সড়ক নির্মাণ হওয়ায় বিগত সময়ে এসব সড়ক পাকা হয়নি। রাঙ্গুনিয়ার সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে বড় বাজেট বরাদ্দ আনতে হবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আপনার পরিকল্পনা কী?

এটা আমার দলেরও পরিকল্পনা যে আমরা গ্রাম পুলিশিংয়ে ফিরতে চাই। কমিউনিটি পুলিশিং শক্ত করলে সামাজিক সংকটগুলো কেটে যাবে। এখানকার জনগণকে ধন্যবাদ দিতে চাই, এখন পর্যন্ত তারা এমন কোনো ঘটনায় জড়াননি। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান সবাই একই পাড়ায় থাকেন। একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকেন। এ ঐক্য ধরে রাখতে যা যা করা দরকার, করব।

রাঙ্গুনিয়া এলাকায় কর্ণফুলীর নাব্যতা কমে গেছে, জেটিগুলো অকার্যকর। বন্দরকেন্দ্রিক নদীটিকে ঘিরে শিল্পাঞ্চল, কর্মসংস্থান বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

আমাদের এখানে ইপিজেড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নদীগুলোকে ব্যবহার না করলে এগুলো কার্যকর হবে না। আমি এটাও বলব, কিছু প্রকল্পে মেগা দুর্নীতির পরিকল্পনাও ছিল। কর্ণফুলীর এ অংশে বছরে চারবার ড্রেজিং দরকার, কিন্তু হয় একবার। আমরা ক্ষমতায় এলে দেশের প্রতিটি নদীর নিয়মিত ড্রেজিংকে প্রাধান্য দেব। বাংলাদেশের পরিচয় নদীমাতৃক হলেও আমরা নদীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করছি না। নদীপথে যদি জেটি করে দেয়া যায় রাস্তার ওপর চাপ কমবে। আমার চেষ্টা থাকবে কর্ণফুলীকে নদীপথ হিসেবে ব্যবহার করে বন্দরে পৌঁছার ব্যবস্থা করা। যাত্রী যোগাযোগ, শিল্প স্থাপন, পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করব।

রাঙ্গুনিয়াবাসীর প্রতি আপনার আহ্বান কী থাকবে?

গত ১৭ বছর মানুষ যে নির্যাতনের মধ্যে ছিল, সে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তা যেন আমরা অন্য কারো ওপর না করি। আমরা সবাই শান্তি চাই। বড় পরিবার হিসেবে একসঙ্গে থাকতে চাই। রাঙ্গুনিয়ার ভবিষ্যৎ রাঙ্গুনিয়ার মানুষই নির্ধারণ করবে, কেউ যেন চাপ সৃষ্টি না করে। আর যদি কেউ জুলুম করে আমাদের ওপর অন্যায় কিছু চাপাতে চায়, আমরা আগের মতোই ঐক্যবদ্ধভাবে সেটি প্রতিরোধ করব।