বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘জনগণের মতামত জনগণকেই নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। দেশের মানুষ আগামী নির্বাচনে তাদের সিদ্ধান্ত দেবে। যে দলগুলো তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করতে চায়, তাদের জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের মতামত নিতে হবে, জনগণের ম্যান্ডেট নিতে হবে। কারো মতামত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া চলবে না।’

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিবিষয়ক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজশাহী বিভাগীয় ব্যবসায়ী ফোরাম এ সভা আয়োজন করে।

আমীর খসরু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবসায়ীরা দেশের সম্পদের বড় অংশ দখল করেছেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কিছু গোষ্ঠী শুধু ব্যবসাই করেনি, ব্যাপক লুটপাটও করেছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের অর্থ হলো প্রতিটি নাগরিক যেন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমান অংশগ্রহণ ও সুযোগ পায়। গ্রামের মানুষ যেন সরকারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, উন্নয়নের সুফল যেন শহরেই সীমাবদ্ধ না থাকে।’

বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘ব্যবসা স্থবির, বিনিয়োগ বন্ধ, অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই হবে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি, যাতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গঠন করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ গত ১৭ বছর ধরে গণতন্ত্র ও মালিকানা ফেরানোর জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে। যারা সেই মালিকানার পথে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের জন্য আমাদের বার্তা স্পষ্ট, জনগণের অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র চলবে না।’

ঐকমত্য কমিশনের বিষয়ে আমীর খসরু বলেন, ‘ঐকমত্য হয়েছে, সই হয়েছে। এখন নতুন নতুন দাবি তোলা হচ্ছে। কমিশনের সদস্যদের নিজস্ব মতামত থাকতে পারে, কিন্তু তাদের মত চাপিয়ে দেয়ার জন্য রাখা হয়নি। তারা নিজ নিজ কাজে ফিরে যান, জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন।’

বিএনপি ক্ষমতায় এলে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে জনগণকে মুক্ত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনলাইনভিত্তিক সেবা বাড়ালে দুর্নীতি কমবে। যত কম সরাসরি অফিসে যেতে হবে, তত কম ঘুস ও হয়রানি হবে। আমরা চাই, সরকার ছোট হোক, জনগণ ক্ষমতায়িত হোক।’

তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও শেয়ারবাজার—সবই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে।

ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সাবেক এ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি অঞ্চলে নিজস্ব প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র (গ্রোথ সেন্টার) তৈরি করতে হবে। আমরা এরই মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করেছি। মেগা প্রকল্পে অর্থ অপচয় না করে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তব উন্নয়নে আমরা বিশ্বাসী।’

নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আগামী ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে জানিয়ে বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘বিভিন্ন সেক্টরে কতজন কাজ করবে, তার পূর্ণ পরিকল্পনা আমরা করেছি। কুটির শিল্প ও আইটি খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৫ শতাংশ হলে কোনো ব্যবসা টিকতে পারে না। আমরা এ হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামাব।’

বিএনপি এরই মধ্যে দেশে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমীর খসরু বলেন, ‘কৃষি, শিল্প কিংবা আইটি—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অপরিহার্য। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার আছে, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা নতুন ভবন না বানিয়ে বিদ্যমান সুবিধাগুলোর পূর্ণ ব্যবহার করব। প্রতিটি জেলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে তরুণরা স্থানীয় পর্যায়ে থেকেই দক্ষতা অর্জন করে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে।’

রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নারী ও কারিগরদের কুটির শিল্পে যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কামার, কুমার, শীতলপাটি কারিগর, কাগজ শিল্পী একটি বড় শিল্পের অংশ। কিন্তু এতদিন তারা সরকারি সহায়তা পাননি। ডিজাইনিং ও ব্র্যান্ডিং করলে স্থানীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। যেমন ৫০০ টাকার শার্ট ভালো ডিজাইন ও বাজারজাতের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতে পারে। আমরা চাই ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রডাক্ট নীতির মতো একটি প্রকল্প বাংলাদেশেও বাস্তবায়ন করা হোক, যাতে প্রতিটি গ্রাম তাদের নিজস্ব পণ্যকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।’

সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. লুৎফর রহমান। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি সুলতান মাহমুদ সুমন, নাটোর চেম্বারের সভাপতি আব্দুল মান্নান, নওগাঁ চেম্বারের সাবেক সভাপতি আলহাজ জাহাঙ্গীর হোসেন, জয়পুরহাট চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমিনুল বারি, হিলি বন্দর আমদানি-রফতানি গ্রুপের সভাপতি ফেরদৌস হক ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর আমদানি-রফতানি গ্রুপের সভাপতি আলহাজ একরামুল হক।