বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলো। জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র নিয়ে তুলনামূলকভাবে মতভেদ না থাকলেও বাকি দুই মূলনীতির ভাষা ও ব্যাখ্যা নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল মাল্টিপারপাস হলে গতকাল অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ষষ্ঠ দিনের বৈঠকে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।
বৈঠক শেষে বিভিন্ন দলের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। তবে আরো আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংশোধন তারা করবে যারা জনগণের ম্যান্ডেট পাবে। আমরা বলেছি, রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে পঞ্চম সংশোধনীতে যে আর্টিকেলগুলো ছিল সেগুলো সংযোজন করব। তবে এতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটা পেন্ডিং রয়ে গেল।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন করতে হবে।’
আর সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বিষয়টি সংযোজনের দাবি জানান তিনি। তার দাবি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও দুই-একটি বাম দল ছাড়া বেশির ভাগ দলই এর সঙ্গে একমত।
সংবিধানে বিদ্যমান মূলনীতি পরিবর্তন করে অবশ্য নতুন মূলনীতি চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তরুণদের এ দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধান ও পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যে মূলনীতিগুলো এসেছে সেগুলো দলীয় মূলনীতি। আর বাহাত্তরের মূলনীতি একটা মুজিববাদী মূলনীতি। অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে, তাদের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে এগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার ও গণতন্ত্র—এ বিষয়গুলোকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’
বাহাত্তরের সংবিধানের বিপক্ষে কথা বলেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ বাহাত্তরের সংবিধান চায় না। ৫ আগস্টেই এর কবর রচনা হয়েছে। মূলত মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর এ মতভেদ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।’
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) বাহাত্তরের সংবিধান সংশোধন করা বা না করার পক্ষে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় ধর্মীয় বিষয়ে পক্ষপাতহীনতার কথা বলেছে। এছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল বাহাত্তরের সংবিধান সংশোধনের বিপক্ষে মত দিয়েছে।
এদিকে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূলনীতি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ শুধু স্বাধীনতাবিরোধীরা ছাড়া সবাই এর পক্ষে। তবে আমরা মনে করি, বিদ্যমান মূলনীতি সমুন্নত রেখে নতুন কিছু যুক্ত করা যেতে পারে। আর আলোচনায় কোনো পয়েন্টে একমত না হলে জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।’
জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে না দিতে ঐকমত্য কমিশনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের বিষয়ে একমত হওয়া যায়নি। যেহেতু বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আমরা মনে করি এ বিষয়ে আরো আলোচনা হতে হবে।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুল রশিদ ফিরোজও সংবিধানের মূলনীতি সংশোধনের বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেন।
এনসিসির প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে ঐকমত্য কমিশন
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (এনসিসি) তাদের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ। দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার ষষ্ঠ দিন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এনসিসির প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে। নতুন প্রস্তাবিত কমিটির কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।’
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) পরিবর্তে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘এ কমিটি শুধু সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অ্যাটর্নি জেনারেল ও তিন বাহিনীর প্রধানের নিয়োগ এ কমিটির অন্তর্ভুক্ত হবে না।’










