ভবনগুলোর পয়োনিষ্কাশন লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে মেশায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সম্প্রতি নয় সদস্যের একটি যাচাই কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভবনগুলোর পয়োবর্জ্য সংযোগ যাচাই করতে টয়লেট, সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল পরিদর্শন করবেন।

গত ২০ মে রাজউকের জারি করা এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়। এতে ঢাকা-১৭ আসনের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি ও একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানীকে উপদেষ্টা রাখা হয়েছে। রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগের একজন সদস্য কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং রাজউকের পরিচালক (জোন-৪) কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন। কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে ভবনগুলোতে সেপটিক ট্যাংক, এসটিপি (সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) বা সোক ওয়েল রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা, সরজমিনে পয়োনিষ্কাশন লাইন পরীক্ষা করা এবং বর্জ্য সংযোগের গন্তব্যস্থল নির্ধারণ করা। ২৫ জুনের মধ্যে কমিটিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ ভবনে এসব ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অধিকাংশ ভবনের পয়োনিষ্কাশন লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে মিশছে, যা লেকের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত করছে এবং স্থানীয় বাসিন্দা বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে নতুন নীতিমালায় পাঁচ কাঠার বেশি জমির ভবনে এসটিপি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদ্যমান ভবনগুলোকেও এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তা স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে; একই সঙ্গে রাজউকের টিমগুলো সংযোগ লাইন যাচাই ও লিখিত অঙ্গীকারনামা সংগ্রহ করছে।’ এছাড়া লেক দূষণ রোধে রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সমন্বয়ে যৌথভাবে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

6

লেকের দূষণ রোধে স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সাময়িক সমাধানে এ প্রজেক্ট নেয়া হয়েছে জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এসব এলাকার ভবনগুলোর পয়োনিষ্কাশন সংযোগ লাইন যাচাইকরণে কমিটি গঠিত হয়েছে। যাচাই করতে বর্তমানে রাজউকের ২০টি টিম নিয়মিত কাজ করছে। শুরুতে ১০টি টিম দিয়ে কাজ শুরু হলেও গত শুক্রবার থেকে টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে হাতিরঝিল ও গুলশান এলাকার নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুলশান ও বারিধারা এলাকায় কোনো কার্যকর সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক নেই। অতীতে নিকেতন, মহাখালী, বনানী, বারিধারা, বাড্ডা ও রামপুরা অঞ্চলের বর্জ্য স্থানান্তরে হাতিরঝিল প্রকল্পের অধীনে লেকের দুই পাশে প্রায় ১ দশমিক ২৫ মিটার ব্যাসের (ডায়ামিটার) পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছিল। সে পাইপলাইনের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বানানো শোধনাগার দাশেরকান্দিতে এসব বর্জ্য পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এখনো সেখানে পৌঁছানোর মতো পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক তৈরি করে বর্জ্য ডাইভারশন করার যে মূল পরিকল্পনা ছিল, তা আজও সম্পন্ন হয়নি। সংযোগ না থাকায় বৃষ্টির পানির লাইনের সঙ্গে পয়োবর্জ্য মিশে যাচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিয়ে বা মেশিন লাগিয়েও হাতিরঝিলের পানিকে পরিশুদ্ধ রাখা যাচ্ছে না এবং প্রকল্পটি তার কাঙ্ক্ষিত রূপ নিশ্চিত করতে পারছে না।’

এর আগেও এ ধরনের যাচাইকরণ কমিটি গঠিত হয়েছে, কোন বাড়িটি কোথায় এবং কিসের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে সে বিষয়ে রাজউকের কাছে স্পষ্ট তথ্য আছে বলে জানিয়েছেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুলশান সোসাইটি গত ১০ বছর ধরে গুলশান লেকের মধ্যে বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য ফেলা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন করে আসছে। সিটি করপোরেশন এবং রাজউক মিলিতভাবে ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দিয়ে লেকে ময়লা ফেলছে। এমনকি সম্পূর্ণ ঢাকারই প্রায় ৮০ শতাংশ বাসাবাড়িতে কোনো কার্যকর সুয়ারেজ লাইন নেই।’

গত ১০ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেককে বর্জ্য ও দূষণমুক্ত রাখতে কঠোর পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একই সঙ্গে লেকটিকে পরিবেশবান্ধব, দৃষ্টিনন্দন ও নাগরিকবান্ধব স্থানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। সভায় লেক থেকে ভাসমান বর্জ্য অপসারণ, তলদেশের পলি পরিষ্কার, পয়োনিষ্কাশনের পানি প্রবেশ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নতুন সেতু নির্মাণ এবং আশপাশের বস্তি এলাকার পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়।

এর আগে ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় লেকটিকে আরো পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব উন্মুক্ত স্থানে রূপান্তরের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে প্রতি মাসের ১৫ ও ৩০ তারিখে কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।