কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকরা অংশ নেন।
এ সময় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, খেলাপি ঋণ কমানো, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এক্ষেত্রে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলো তিনি তুলে ধরেন। মূলত মোস্তাকুর রহমানের আমন্ত্রণেই সম্পাদক পরিষদের নেতারা এ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
মতবিনিময় সভায় সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী ও আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন উপস্থিত ছিলেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে অংশ নেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. মো. হাবিবুর রহমান, মো. জাকির হোসেন চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকটি চলে প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী।
সভার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে কিছু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) উন্নয়ন ও সমন্বয়ের কাজ শেষ হলে পুনর্গঠন কার্যক্রম আরো গতি পাবে।’ খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি আনতে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান গভর্নর। একই সঙ্গে আদায় অযোগ্য ঋণ নিষ্পত্তির জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন’ প্রণয়নের কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাজ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, যা দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’ ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করাই বর্তমান সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল সম্পাদক পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ছবি: বাংলাদেশ ব্যাংক
বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বড় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কেও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের অবহিত করা হয়। আর ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার নিয়ে গভর্নর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে। এর আওতায় ডিজিটাল ন্যানো-লোন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ঋণ মূল্যায়ন এবং স্বয়ংক্রিয় ক্রেডিট অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডেন্টিটি, ওয়ান ওয়ালেট” ধারণা বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে চলছে।’
তিনি আরো জানান, ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণ এবং লেনদেনকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় এনে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হবে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তির বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘অনুমোদিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ডলার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আবেদনের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিচ্ছে। এছাড়া “ইউপিএএস” সুবিধার আওতায় বিল ডিসকাউন্টিংয়ে ব্যবহৃত তহবিলের সুদহার কমানো হয়েছে, যা আমদানি পণ্যের ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।’
মতবিনিময় সভায় সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শ দেন। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ নিয়ে সভায় আলোচনা হয় বলে জানান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর। বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা, নিম্নমুখী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংক একীভূতকরণসহ নানা বিষয়ে মানুষের মাঝে দুশ্চিন্তা আছে। সামনে বাজেট অধিবেশন আসছে। আমরা এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চেয়েছি। বিশাল আকারের খেলাপি ঋণের বিষয়ে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিংবা ওনারা নতুনভাবে কী কী করার চেষ্টা করছেন, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। মূলত পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের অর্থনীতিকে বোঝার চেষ্টা করেছি। ওনারা সম্পাদকদের কাছ থেকে বেশকিছু বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন।’
সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, ‘ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, বেসরকারি খাত কিংবা আমানতকারীদের আস্থা নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে একধরনের সংকেত দেয়। এমনকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাংকের সার্বিক চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সম্পাদক পরিষদ থেকে আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করেছি। উভয় পক্ষে ব্যাংক খাতের বিরাজমান সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।’










