চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়লেও গত বছরের তুলনায় কমেছে মৃত্যুর হার। গত বছর মশাবাহিত রোগটিতে মৃত্যু হয়েছিল ৪৫ জনের। এ বছর সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬-এ। তবে এক বছরের ব্যবধানে আক্রান্তের হার বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল ৪ হাজার ৩২৩ জন, চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮২৬ জনে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে ৫০৩ জন বা ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত শনাক্তকরণে মৃত্যুহার কমলেও আক্রান্তের ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমিত নেই। গত বছরের প্রথম ছয় মাস তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে বছরের প্রায় সব মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বরতদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮২৬ জন এবং মারা গেছে ২৬ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ২ হাজার ৬৩৮ ও বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ জন। এ বছর নগরীতে মারা গেছে ২০ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় মারা গেছে ছয়জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৫০৫, নারী ১ হাজার ৪৩০ জন ও শিশু ৮৯১টি। অন্যদিকে মারা যাওয়া ২৬ জনের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ, নারী সাতজন ও শিশু পাঁচটি।

বিগত বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ২৭১ জন, মারা যায় পাঁচজন। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৪৫ এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৪১। ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৪ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ১০৭ জন। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৩২৩ জন আক্রান্তের পাশাপাশি মারা যায় ৪৫ জন।

আক্রান্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩৫ জন চিকিৎসা নিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) ৮৫২, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৪৩৪, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ২১৬, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৪১ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে মারা গেছে ১৬ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে একজন এবং বেসরকারি হাসপাতালে মারা গেছে নয়জন।

চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর হার কমার পেছনে প্রধান কারণ হলো দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নতি। এখন মানুষ জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে যাচ্ছে, চিকিৎসকরাও ঝুঁকিপূর্ণ রোগী দ্রুত চিহ্নিত করে সময়মতো পর্যবেক্ষণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছেন। ফলে জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই অনেক রোগী সুস্থ হয়ে উঠছে। আক্রান্তের হার বাড়ার ধারাটি উদ্বেগজনক, বিশেষ করে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমভিত্তিক রোগে সীমিত নেই। বছরের প্রায় সব মাসেই আক্রান্ত বাড়ছে। নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেনেজে পানি জমে থাকা, পরিত্যক্ত টায়ার ও প্লাস্টিকের পাত্রসহ পানি জমার উৎসগুলো এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় কেবল ফগিং মেশিন নয় বরং বছরব্যাপী লার্ভা ধ্বংস, হটস্পটভিত্তিক নজরদারি ও উৎসস্থল ধ্বংস জরুরি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিগত বছরের তুলনায় আক্রান্ত কিছুটা বেড়েছে। তবে যারা এখন আক্রান্ত হচ্ছে, তারা প্রাথমিক উপসর্গ দেখা যাওয়ার পর পরই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে। এ কারণে আক্রান্তরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে। মৃত্যুর সংখ্যাও কমে গেছে। ডেঙ্গু নিয়ে নগরী ও জেলার হাসপাতালগুলোয় অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য সব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মূলত চলতি বছর বৃষ্টিপাত একুট বেশি হওয়ায় আক্রান্ত বেড়েছে। তবে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত তিন ভাগের দুই ভাগ কমে গেছে।’

চলতি বছরের ১২-১৮ জুলাই নগরীর ছয়টি এলাকায় জরিপ চালায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরীর চট্টেশ্বরী রোড, ওআর নিজাম রোড, আগ্রাবাদ, পাহাড়তলী, হালিশহর ও ঝাউতলায় জরিপ করা হয়। এসব এলাকার এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল আগ্রাবাদে, ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এরপর পাহাড়তলীতে ১১০ শতাংশ, হালিশহরে ৬৬ দশমিক ৬৭, চট্টেশ্বরীতে ৪৮ দশমিক ৩৯, ওআর নিজাম রোডে ৪২ দশমিক ৮৬ ও ঝাউতলায় ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এসব এলাকার মশার মধ্যে ৬৫ শতাংশ এডিস ইজিপ্টাই ও ৩২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল এডিস আলবোপিকটাস।

২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জুন-নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়ার দ্রুত বিস্তার এবং ডেঙ্গু ১০ শতাংশ ও জিকার ১ দশমিক ১ শতাংশ বিস্তার ঘটছে। নগরীর কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এবং উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারায় আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের তীব্র অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়েছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি হচ্ছে। জিনগত বিশ্লেষণে পাকিস্তান-ভারত-থাইল্যান্ডের ভেরিয়েন্টের সঙ্গে সাদৃশ্যসহ অর্ধশতাধিক মিউটেশন শনাক্ত হয়। প্রায় ১ হাজার ৭৯০ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব উপাত্ত পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১৮-৩৫ বছর বয়সী পুরুষ ও শহরাঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীরা বেশ সচেতন। রোগের উপসর্গ পাওয়া মাত্র চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব কারণে আক্রান্তরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালগুলোয় রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়া হচ্ছে।’