জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অযৌক্তিক, অবিবেচনাপ্রসূত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের দিন ছাড়া গণভোটের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেবে না বিএনপি।

জুলাই জাতীয় সনদের কয়েকটি দফা বিএনপির অগোচরে সংশোধন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। যার অন্যতম শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে টাঙানো-সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্ত করার ব্যাপারে ঐকমত্য হলেও সনদে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দেয়া সুপারিশকে ‹একপেশে› উল্লেখ করে, তা জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান সংস্কার বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিধানকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হাস্যকর’ বলেও মনে করে বিএনপি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপি জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি রচনা এবং জনগণের সম্মতি নেয়ার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের প্রস্তাব করেছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। সেক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে প্রস্তাবিত গণভোট অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সময় স্বল্পতা ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল অংকের ব্যয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ব্যাপক লোকবল নিয়োগ এবং একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো বিশাল আয়োজনের বিবেচনায় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। একই আয়োজনে ও একই ব্যয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠান করা বাঞ্ছনীয়।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের জাতীয় প্রত্যাশা এবং শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়।’

রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার বিএনপির অন্যতম এজেন্ডা এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর আগেই বিএনপি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে জাতির সামনে ৩১ দফা উপস্থাপন করে। তার আগে ২০২২ সালে ২৭ দফা এবং ২০১৭ সালে ভিশন-২০৩০ প্রকাশ করে। অতএব বিএনপি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তি ও শক্তিগুলো জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সার্বিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আসছে। সুতরাং রাষ্ট্র কাঠামোর প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা।’

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সংস্কার কমিশনগুলোর কাছে আমরা সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের দলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত মতামত দিয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের মতামত দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই ছয়টি সংস্কার কমিশনের সঙ্গে আমাদের এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ আলোচনা হয়। ছয়টি সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রণীত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপরই দফাভিত্তিক আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেসব আলাপ-আলোচনার ফলস্বরূপ প্রণীত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা।’

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথম বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে এনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় সনদ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হবে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সেই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবে। তিনি জাতির উদ্দেশে দেয়া বিভিন্ন ভাষণেও তার এ বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। জুলাই ঘোষণাপত্রেও এ বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।’