বাংলাদেশে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অর্থায়ন চার গুণ বাড়িয়ে বছরে ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশসহ অন্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রকিউরমেন্ট ও ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বিজনেস অপরচুনিটি সেমিনারে এডিবি ও বিশ্বব্যাংক তাদের এ পরিকল্পনা তুলে ধরে। এতে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, ঠিকাদার, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮০০ প্রতিনিধি অংশ নেন।
এডিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশের টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করতে তারা ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবে।
সেমিনারে ‘এডিবি ও বেসরকারি খাত: বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন’ অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির লিড ইনভেস্টমেন্ট অফিসার বিদ্যুৎ কুমার সাহা। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জিডিপির আকারে সরকারি খাতের অবদান ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের অবদান ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ। কর্মসংস্থানে সরকারি ৫ থেকে ৭ শতাংশ এবং বেসরকারি ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ অবদান রাখে। রফতানিতে সরকারি খাত ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি খাত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, বিনিয়োগে সরকারি খাত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং বেসরকারি খাত ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণে সরকারি ৮ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাত ২ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখে।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে বেসরকারি খাতকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, প্রচলিত সরকারি অর্থায়ন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। সরকার অনুমোদিত ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক’ পরিকল্পনায় আগামী ২০ বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে অর্ধেক বিনিয়োগ বেসরকারি খাত থেকে আসার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়, এ বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
এডিবি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ, সিমেন্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল লজিস্টিক খাতে সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। সংস্থাটি ঋণের পাশাপাশি ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি গ্যারান্টির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে সহায়তা করছে। এতে করে বড় বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝুঁকি কমানো এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালে ২ হাজার ১৮৯ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সহায়তা অনুমোদন করেছে, যা ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ২ হাজার ৫৭০ বিলিয়ন ডলার।
এডিবি জানায়, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এরমধ্যে সবুজ অবকাঠামো, ডিজিটাল অবকাঠামো ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল উৎপাদন খাত। এছাড়া কৃষি, ব্যাংক ও সামাজিক খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিশ্বে অর্থের অভাব নেই; কিন্তু বিনিয়োগযোগ্য মানসম্পন্ন প্রকল্পের অভাব রয়েছে।
এ সময় বাংলাদেশে বন্ড বাজারের চিত্র তুলা ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্ব বন্ড মার্কেটে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নাজুক। বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের আকার শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, ফিলিপাইন ৩২ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়ার ৬২ ও ভারতের ১৩৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার চেয়েও এর করপোরেট বন্ড বাজার অনেক ছোট। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি অর্থায়নের সুযোগ সীমিত।
এদিকে এডিবি তাদের ক্রয় নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ‘সর্বনিম্ন দর’ ভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ‘সবচেয়ে সুবিধাজনক বিড’ পদ্ধতি চালু হবে। নতুন এ ব্যবস্থায় দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু দাম নয়, বরং কাজের গুণমান, স্থায়িত্ব, উদ্ভাবন এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়া হবে। এতে উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকও তাদের প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় একাধিক সংস্কার এনেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্রে গুণগত মানের জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে শুধু কম দর দিয়ে কাজ পাওয়ার সুযোগ কমে আসবে। এছাড়া বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে স্থানীয় কর্মীদের জন্য অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রম ব্যয় সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। এতে দেশীয় কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যেও বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সরাসরি পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন এডিবি বাংলাদেশের আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর আকিরা মাতসুনাগা, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এডিবি উইং প্রধান এসএম জাকারিয়া হক।
আকিরা মাতসুনাগা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে শুধু অর্থায়নই নয়, শক্তিশালী অংশীদারত্ব এবং কার্যকর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। এ ধরনের সেমিনার সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় করে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
জ্যঁ পেসমে বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগী, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত কাজের গুরুত্ব তুলে ধরেন। অন্যদিকে এস এম জাকারিয়া হক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
এছাড়া বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এস এম মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সঙ্গীতা আহমেদ অংশ নেন।










