বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল ব্যবহার করে নারী অবমাননাকর পোস্ট দেয়ার ঘটনা ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দলটির আমিরের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। হ্যাকাররা স্বল্প সময়ের জন্য এক্স অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নারীদের জন্য অবমাননাকর একটি স্ট্যাটাস দিয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পরপরই আপত্তিকর ওই স্ট্যাটাস ডিলিট করা হয়। একই সঙ্গে সাইবার হামলার বিষয়টি জানিয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়া স্ট্যাটাসটি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নারী অবমাননার অভিযোগ তুলে গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ছাত্রদলসহ বাম ছাত্রসংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। সমাবেশ থেকে জামায়াতবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানের পাশাপাশি জামায়াত আমিরকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অবশ্য সন্ধ্যায় বিএনপি ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রশিবির।

গতকাল সকালে রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে জামায়াত। সেখানে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কে বা কারা হ্যাক করেছে। জামায়াতের তথ্যপ্রযুক্তি দল এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। কারা এ কাজ করেছে, সেটি জানার চেষ্টা করছে। যারা জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছে, তারা কয়েকদিন ধরেই এ প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এখানে একটা গভীর ষড়যন্ত্র আছে। জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তারা কিছু খারাপ ও আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে। কিছু লোক ওই স্ট্যাটাসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কর্মসূচি দিয়েছে। জামায়াতের আশঙ্কা, এ কাজের সঙ্গে বিশেষ একটি দল বা তাদের সাইবার টিমের কিছু চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকারী জড়িত আছে। তবে কোন দল এ কাজ করছে, সে বিষয়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সরাসরি কারো নাম বলেননি। অ্যাকাউন্ট হ্যাকের বিষয়ে শনিবার রাতেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আইনিসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াত আমিরের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে শনিবার বিকাল ৪টায় সর্বশেষ পোস্ট করা হয়েছিল। এরপর সেটি হ্যাক করে ৪টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি আপত্তিকর পোস্ট করা হয়। জামায়াত বিষয়টি জানতে পারে বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটের দিকে। এরপর জামায়াত আমিরের এক্স হ্যান্ডল যারা পরিচালনা করেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, এটি হ্যাক করা হয়েছে।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে ৫টা ৯ মিনিটের দিকে অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করা হয় এবং ৫টা ২২ মিনিটে একটি রিজয়েন্ডার (প্রতিবাদ) দিয়ে জানানো হয়, অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছে। এরপর দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শুধু দলের আমির নয়, জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকটি পেজের ওপরে কিছুদিন ধরে সাইবার হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট কীভাবে হ্যাক করা হয়েছে, তা তুলে ধরেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘শনিবার বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট করা হয়। সেটি দেখতে পেয়ে ৫টা ৯ মিনিটে অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা হয়েছে। জামায়াত আমিরের অ্যাকাউন্ট থেকে এ পোস্টের পর বিকাল ৪টা ৫৩ মিনিটের দিকে দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও এ বিষয়ে একটি পোস্ট করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসঙ্গে দুটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে।’

জামায়াত আমিরের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি দেয়ার ১-২ মিনিটের মধ্যে স্ক্রিনশট নিয়ে সেটি ৫-৬ ঘণ্টা পরে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান এ প্রকৌশলী। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমিরের অ্যকাউন্ট থেকে পোস্ট করার আধা ঘণ্টার মধ্যেই জামায়াত বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, আইডি হ্যাক করা হয়েছে।’

মাহমুদুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারি মেইল ব্যবহার করে এ কাজ করা হয়েছে। কেউ ‘assistantprogrammar@bangabhaban.gov.bd—এই সরকারি মেইল ব্যবহার করে স্যাবোটাজ করে জামায়াতের মেইলে একটি ফাইল পাঠিয়েছে। যেখানে নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য আছে বলে একটা ফাইল অ্যাটাচ করা ছিল। যার মেইল থেকে এসেছে, তার নাম মোহাম্মদ সরোয়ার আলম, তিনি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে কাজ করেন। এছাড়া কিছুদিন ধরে জামায়াতের পেজগুলোয় এ ধরনের অনেক আক্রমণ চালানো হয়েছে। সরকারি মেইল ব্যবহার করে জামায়াতের অফিশিয়াল কিংবা ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের মেইল কীভাবে ফিশিং করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেটি জানতে চেয়ে সাইবার সিকিউরিটি কাউন্সিলে আবেদন জমা দেয়া হবে।

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়া ওই স্ট্যাটাসে বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিকতার নামে যখন নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেয়া হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে। এটা আসলে পতিতাবৃত্তিরই আরেক রূপ।’