ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামীকাল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আয়োজিত এ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। জুলাই আন্দোলনের পর তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সক্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তাদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া এ তরুণ ভোটাররাই নির্বাচনী ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেন।

২০০৮ সালে দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৮ কোটি ১০ লাখ। বর্তমানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখে। নবম থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সময়ে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৪ কোটি ৬৭ লাখেরও বেশি। এ বাড়তি ভোটারের বড় অংশই তরুণ—যাদের হাতেই এবার নির্বাচনের ফল নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক থাকার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নাগরিক যুব হিসেবে সংজ্ঞায়িত। তবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩৩ বছর বয়স পর্যন্ত ভোটারদের তরুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, গত দেড় দশকে একতরফা ও কারচুপির অভিযোগে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। তবে জুলাই আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তরুণদের একটি বড় অংশ এতদিন কখনো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। ফলে এবার তারা সচেতনভাবেই ভোট দিতে আগ্রহী হবে। তরুণ ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকেই জয়ের পাল্লা ভারী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ইসির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৮-২১ বছর বয়সী ভোটার আছে ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন। ২২-২৫ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন, ২৬-২৯ বছর বয়সী আছে ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন আর ৩০-৩৩ বছর বয়সী ভোটার আছে ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন।

wee

বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী তাদের নির্বাচনী ইশতাহারগুলোয় তরুণ সমাজকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ইশতাহার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব দলই টেকসই কর্মসংস্থান, মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইশতাহার তৈরি করেছে। এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে বিভিন্নভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমান শ্রমবাজারের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং দেশ গঠনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলছে রাজনৈতিক দলগুলো।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের প্রভাষক মাহিনুর বেগম মিমি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এমন অঙ্গীকারগুলো, যা বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে এসব উপাদান নিশ্চিত হলে তরুণদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতির সংযোগ খুঁজে পায়। নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে তরুণ সমাজ মূলত এমন পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে, যা নীতিগত ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে কার্যকর কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করবে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের উদ্যোগ তরুণদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তরুণরা শুধু উপকারভোগী নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার দায়িত্বশীল অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে।’

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন।

ইসির মোট ভোটারের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ৩৪-৩৭ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ২৩ লাখ ৬ হাজার ৭৫৫ জন। ৩৮-৪১ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৪৫০ জন। এছাড়া ৪২-৪৫ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২ জন, ৪৬-৪৯ বছরের ৯২ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৩, ৫০-৫৩ বছরের ৮০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০, ৫৪-৫৭ বছরের ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ২৮, ৫৮-৬০ বছরের ৫১ লাখ ৮১ হাজার ১০৩ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সের ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন।