অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে খুলনার চারটি করোনা হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের। ধারণক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি হাসপাতালগুলোয়। একটি বেসরকারিসহ চারটি করোনা হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ১৫ জন। এর মধ্যে ১৪ জন করোনা আক্রান্ত ও একজনের উপসর্গ ছিল। এ নিয়ে খুলনা বিভাগে ২৪ ঘন্টায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
খুলনায় সরকারিভাবে মাত্র ১০০ শয্যা নিয়ে করোনা চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু স্বল্প দিনের ব্যবধানে এখন শয্যা সংখ্যা ৪৩৫। একটির জায়গায় যুক্ত হয়েছে তিনটি সরকারি ও বেসরকারি একটি হাসপাতাল। এর পরও শয্যা সংকট কাটছে না। ফলে রোগীদের কাছে এখন হাসপাতালের মেঝেই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়োজ মোহাম্মদ শয্যা সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, মে থেকেই করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীর চাপ সামলাতে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০০ শয্যার করোনা ইউনিটকে ১৩০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তাতেও রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে খুলনা সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরো ৭০ শয্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানেও এক সপ্তাহের মধ্যে সবক’টি শয্যা পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট আরো ৭০ শয্যা বাড়িয়ে ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে।
এতেও রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে সর্বশেষ শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ৪৫ শয্যার করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে। সেখানেও একই রকম রোগীর চাপ। এ অবস্থায় হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শনিবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলায় অবস্থিত ১৩০ শয্যার করোনা ইউনিটে ছয় করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরো একজন।
খুলনা সদর হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। আর বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ছয়জন। শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে শনিবার রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় সেখানে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটের মুখপাত্র চিকিৎসক সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে খুমেকে আরো ৭০ শয্যা বাড়িয়ে ২০০ শয্যা করা হয়েছে। কিন্তু চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
গতকাল সকাল পর্যন্ত সেখানে রোগী ভর্তি আছে ১৯৭ জন। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০২ এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগী ৪১ জন। এছাড়া ওই হাসপাতালের এইচডিইউ ইউনিটে ২০ জন ও আইসিইউতে ২০ জন রোগী ভর্তি আছে। হাসপাতালটিতে ২৪ ঘণ্টায় রেড জোনে ১৪ ও ইয়োলো জোনে ২৪ রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৫ জন।
এদিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা সদর হাসপাতালে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি ৬৫ জন। ওই হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক কাজী আবু রাশেদ জানান, ২৪ ঘণ্টায় ওই হাসপাতালে ১৫ জন নতুন করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৮ জন।
খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক প্রকাশ চন্দ্র বলেন, ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২৪ জন করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে আছে সাতজন।
বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী মিজানুর রহমান বলেন, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ১২০ শয্যার করোনা ইউনিটে বর্তমানে ভর্তি ১১৫ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আটজন ও এইচডিইউতে ১০ জন চিকিৎসাধীন। ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ২৩ জন ভর্তি হয়েছে ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২২ জন।
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. শেখ সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা জানান, ২৪ ঘণ্টায় করোনায় খুলনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা জেলার ১০ জন। এ সময়ে ৪৩৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৫০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ হার ৩৪ শতাংশ।
এ পর্যন্ত জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৮৭ জনের। মারা গেছে ৩০০ জন এবং সুস্থ হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ জন।
ডা. ঊষা আরো বলেন, গত বছরও এ সময়ে করোনা বেড়েছিল, এ বছরও ঠিক সেই সময়ে বেড়েছে। এবার বেশি হওয়ার কারণ ভ্যারিয়েন্টের তীব্রতা। করোনায় আক্রান্তদের যে সংখ্যাটা আসছে এর বাইরেও প্রতিটি পরিবারে কারো না কারো করোনার লক্ষণ রয়েছে। সর্দি জ্বরের সিজন হওয়ায় অনেকে এটা অবহেলা করেছে। এ কারণে করোনা বেড়ে গেছে।
হাসপাতালে যারা করোনায় মারা যাচ্ছে তারা অধিকাংশ ৬০-৭০ বছর বয়সের। তাদের যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তখন আর আইসিইউতে নিয়েও কিছু করার থাকে না।









