সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে উদ্ভাবনী ধারণা বিনিময়ের লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর নর্থ নাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সোশ্যাল বিজনেস ইনোভেশন সামিট ২০২৬’। আজ মঙ্গলবার এনএসইউর স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স (এসবিই), ইউনূস সেন্টারের সহযোগিতা এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি ও ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ সম্মেলনের উদ্বোধন হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেছার ইউ. আহমেদ। আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী এবং উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ইউনূস সেন্টার ও গ্রামীণ হেলথকেয়ার ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ।
এতে আরো ছিলেন থাইল্যান্ডের ইউনুস সেন্টার–এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ফয়েজ এইচ শাহ, এনএসইউর স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, তাইওয়ানের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সহযোগী ডিন ড. চিয়েন-ওয়েন শেন, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব এবং মালয়েশিয়ার আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক দাতো’ ইর. ড. মোহাম্মদ সালেহ বিন জাফার।
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক ড. নেছার ইউ আহমেদ বলেন, সামাজিক ব্যবসা আমাদের শেখায়, প্রকৃত সাফল্য শুধু মুনাফায় নয়, বরং মানুষের কল্যাণ করা। এ ধরণের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল গ্র্যাজুয়েট গড়েতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এনএসইউ উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি শিক্ষা, সামাজিক ব্যবসা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সক্ষম করে তুলতে কাজ করছে। উদ্যোক্তা মনোভাব, সৃজনশীলতা এবং সমাজমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে তারা যেন বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে এবং ইতিবাচক সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, সে লক্ষ্যেই আমাদের প্রচেষ্টা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে লামিয়া মোরশেদ বলেন, বর্তমান প্রজন্ম সবচেয়ে শক্তিশালী, কারণ তারা সচেতন, সাহসী এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে চায় না। তরুণদের এ উদ্যমই একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা জাগায়। আমি তরুণ উদ্যোক্তাদের এমন ব্যবসা গড়ে তোলার আহ্বান জানাই, যা শুধু মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজের কল্যাণ এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ, সম্পদের বৈষম্যহীনতা ও বেকারত্বমুক্ত বিশ্ব গঠনে ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে। দেশের প্রয়োজনে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। আমি বিশ্বাস করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভবিষ্যতেও মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা এবং দেশের প্রয়োজনে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যাবে।
পরবর্তীতে ‘বিয়ন্ড প্রফিট: রিডিফাইনিং বিজনেস ফর দ্য নেক্সট জেনারেশন’ শীর্ষক প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সেশনে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার প্রসঙ্গ তুলে ধরে থাইল্যান্ডের ইউনুস সেন্টার–এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ফয়েজ এইচ শাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই বুঝতে হবে, সুনাম ও উদ্দেশ্যই ব্যবসার সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি। অধ্যাপক ইউনূস দেখিয়েছেন, সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করেও লাভ করা সম্ভব। বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমেই এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করা যায়।
তাইওয়ানের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সহযোগী ডিন ড. চিয়েন-ওয়েন শেন বলেন, নিজেদের শক্তির জায়গায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কারণেই আজকের এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, কার্যকর নীতি ও সফল বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
মালয়েশিয়ার আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক দাতো’ ইর. ড. মোহাম্মদ সালেহ বিন জাফার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এতে জ্ঞান বিনিময় ও পারস্পরিক শিক্ষা ত্বরান্বিত হবে এবং নিজ নিজ দেশের স্থানীয় সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা সহজ হবে।
এরপর সামাজিক ব্যবসা ও টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে একযোগে একাধিক ব্রেকআউট সেশন আয়োজন করা হয়। এসব সেশনের মধ্যে ছিল ‘রিইম্যাজিনিং ফুড সিকিউরিটি থ্রু সোশ্যাল বিজনেস: দ্য রিজক মডেল অ্যান্ড ইটস রিপ্লিকেশন পটেনশিয়াল’, ‘ইএসজি অ্যান্ড সোশ্যাল বিজনেস: অ্যাকাডেমিক পার্সপেকটিভস’, ‘ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স: দ্য ফিউচার অব মাইক্রোক্রেডিট’, ‘সোশ্যাল বিজনেস ইকোসিস্টেম ইন অ্যাকশন’, ‘হার ভেঞ্চার, হার ইমপ্যাক্ট: জেন্ডার ইকুইটি ইন সোশ্যাল এন্টারপ্রেনারশিপ’, ‘ফান্ডিং দ্য মিশন: ফাইন্যান্সিং সোশ্যাল ইনোভেশন ইন বাংলাদেশ’, ‘হেলথকেয়ার ইনোভেশন্স’, ‘ইভলভিং রোল অব অ্যাকাডেমিয়া ইন সোশ্যাল বিজনেস’, ‘ইএসজি মডেল ইমপ্লিমেন্টেশন: প্র্যাকটিশনার ইনসাইটস’ এবং ‘সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ ইন প্র্যাকটিস: হংকং পার্সপেকটিভস’।
এছাড়া সম্মেলনে ‘স্টার্টআপ অ্যান্ড সোশ্যাল বিজনেস ইনোভেশন সেশন’ এবং দিনব্যাপী ‘সোশ্যাল বিজনেস ইনোভেশন শোকেস’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থী, স্টার্টআপ এবং সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী উদ্যোগ, প্রকল্প ও পণ্য প্রদর্শন করা হয়।
‘সৃজন, স্থায়িত্ব, রূপান্তর—পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক উদ্ভাবকদের ক্ষমতায়ন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত সোশ্যাল বিজনেস ইনোভেশন সামিট ২০২৬ দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক উদ্ভাবনের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ইউনুস সেন্টারের প্রতিনিধি, দেশী-বিদেশী প্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পখাত ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।










