ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে ফেনীতে বাঁধ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জেলা শহরের ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গতকাল আয়োজিত ১১-দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।

জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফেনীতে যে বাঁধটির কারণে আপনাদের দুঃখ, সেটি এখনো নির্মাণ হয়নি। আমরা জানি আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একটু ব্যাপার-স্যাপার আছে। আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। আশা করি তারাও আমাদের শ্রদ্ধা করবে। আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেন, তাদের সঙ্গে ফ্রুটফুল ডায়ালগের মাধ্যমে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করব।’

এদিকে নোয়াখালীকে বিভাগ করারও প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। ফেনীর পর নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১-দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অঙ্গীকার করেন। নোয়াখালীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নোয়াখালীর অনেকগুলো ন্যায্য দাবি আছে। আমি সেগুলো এখানে পেয়েছি। নোয়াখালীবাসী বিভাগ চায়, সিটি করপোরেশন চায়। আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের মাধ্যমে আপনাদের এ প্রাণের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।’

ফেনীর জনসভায় শফিকুর রহমান জেলার উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘১৮ কোটি মানুষের দেশে ৬৪টি জেলার কোনো জেলা মেডিকেল কলেজ থেকে বঞ্চিত হবে না। ফেনীতেও সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে। এছাড়া ফেনীর স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যু হিসেবে তৈরি করা হবে।’

বাঁধ ও ফেনীবাসীর ভোগান্তি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে গোটা ফেনী জেলা সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সেই সময় আমরা ছুটে এসেছিলাম। ফেনী পর্যন্ত পৌঁছার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ কোমরপানি ভেঙে চলাচল করেছে, আমিও কোমরপানি ভেঙে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। সেদিন আপনাদের দুঃখ-দুর্দশা শুধু দেখেছি আর চোখের পানি ফেলেছি। ওই সময় ভাঙা বাঁধের জায়গায় যেতে পারিনি, পরে অনুকূল পরিবেশ এলে সে জায়গাটি দেখতে গিয়েছিলাম। এটি আমাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।’

ফেনী নদী নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আজকে আমার বড়ই মনে পড়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এই ফেনী নদী নিয়ে দুটি কথা বলেছিল, এজন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে। ফেনীবাসী, আবরার ফাহাদের রুহকে আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। আবরার ফাহাদকে আপনাদের কলিজায় একটু জায়গা দিয়ে রাখবেন। সে দেশের ন্যায্য প্রাপ্যতার কথা বলেছিল। যারা আধিপত্যবাদের দোসর তারা তাকে সহ্য করতে পারেনি।’

ফেনী-১ আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা এবং ফেনী-২ আসনে জোট প্রার্থী এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর হাতে ঈগল প্রতীক তুলে দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা যাদের উপহার দিয়েছি, তাদের কোনো দলের নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপহার দিয়েছি। এখানে ১১টি দল আমরা একাকার। যাদের যে মার্কা দেয়া হয়েছে, এটাই ১১ দলের মার্কা।’

নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রথম ভোটটা দেবেন “হ্যাঁ”। হ্যাঁ মানেই আজাদী, না মানেই গোলামি। দ্বিতীয় ভোটটি হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হেফাজতের পক্ষে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন সাধারণ রিকশাচালক ভাইয়ের সন্তানও মেধা বিকাশের মাধ্যমে একদিন প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, সেই সংস্কৃতির ধারা আমরা পাল্টে দিতে চাই।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নারী অধিকারের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের কাছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমান। মা-বোনদের ব্যাপারে অপপ্রচার চালানো হয়, যে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না। এটি মিথ্যা। আমরা মায়েদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা—দুটিই নিশ্চিত করব। কওমি মাদ্রাসা নিয়েও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা বলব, কওমি মাদ্রাসা আমাদের কলিজা।’

লক্ষ্মীপুর সরকারি সামাদ স্কুল মাঠে ১১ দল আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল বেলা ৩টায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের আমানত ও ভোটে জয়ী হওয়ার সুযোগ পেলে ১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশের চিত্র পাল্টে যাবে। দেশের ৯০ শতাংশ চাঁদাবাজের হাত চিরতরে অবশ করে দেয়া হবে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি চললেও আগামীতে তা আর সহ্য করা হবে না। চাঁদাবাজ কার বাবা, কার মা বা কার সন্তান তা দেখা হবে না। আমরা সেদিন হব নির্দয়, নিষ্ঠুর ও কঠোর। যারা রাজনীতি করবেন আবার চাঁদাবাজিও করবেন, তাদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।’

কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে গতকাল সন্ধ্যায় কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ঘরে ঘরে এখন কার্ড বিতরণ হচ্ছে, নাম তার ফ্যামিলি কার্ড। ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে মায়ের হাতে, বাবার হাতে না। কী চমৎকার! এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড, আরেক হাতে মায়ের গায়ে হাত। বাংলাদেশের মানুষকে এত বোকা মনে করেছেন? সবাই নিজের বুঝটা ভালো করেই বোঝে। আমার মায়েরা এখন ওপেনলি বলেন, তারা এ অনিরাপদ বাংলাদেশ আর দেখতে চান না। তারা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চান। মায়েরা মনে করেন, দাঁড়িপাল্লা আর তার সঙ্গীরাই তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে।’