বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। এর প্রভাবে নির্মাণ খাতের কর্মযজ্ঞ আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় সিমেন্টের চাহিদাও কমেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এতে চলতি ২০২৪ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় ও মুনাফা দুটোই কমেছে। গতকাল অনুষ্ঠিত সভায় চলতি হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের পর্ষদ।

প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি কমেছে ৫ শতাংশ। প্রথমার্ধে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২৪৩ কোটি টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৬২ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৩৩ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ২ টাকা ৯ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩ টাকা ১১ পয়সা।

কোম্পানিটির কর্মকর্তারা বলছেন, নির্মাণ খাতে চাহিদা কমায় কোম্পানির নিট বিক্রি কমেছে। এছাড়া ব্যয় বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পরিচালন মুনাফা কমেছে ২৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে বছরের বাকি সময়টাও চ্যালেঞ্জিং হবে। তা সত্ত্বেও কোম্পানির পারফরম্যান্স ভালো হবে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে চলতি হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট বিক্রি হয়েছে ৬১৬ কোটি টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬৭১ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি কমেছে ৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৭১ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৫৩ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৬৯ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৪৭ পয়সা।

লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ইকবাল চৌধুরী কোম্পানির আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে বলেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে নির্মাণ খাতে। ফলে প্রথম ছয় মাসে আমাদের কোম্পানির বিক্রিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বিক্রির বিভিন্ন চ্যানেলগুলোর সম্প্রসারণ, অ্যাগ্রিগেটস ব্যবসা শক্তিশালী করা, ডিজিটালাইজেশন ও জিওসাইকেলের মাধ্যমে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসেবা প্রদানে আমাদের আলোকপাত অব্যাহত রয়েছে। আমরা আশা করছি বছরের বাকি সময়টাতে ব্যয় সংকোচন ও নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হব।’

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরে লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৫ টাকা ১২ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ৩ টাকা ৮৩ পয়সা। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা ১৪ পয়সায়, আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ১৫ টাকা ২৫ পয়সা। 

কোম্পানিটির ঋণমান দীর্ঘমেয়াদে ‘‌ট্রিপল এ’ ও স্বল্পমেয়াদে ‘‌এসটি-ওয়ান’। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও রেটিং ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক অন্যান্য পরিমাণগত ও গুণগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ প্রত্যয়ন করেছে ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরআইএসএল)।  

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক হোলসিম গ্রুপ ও স্পেনভিত্তিক সিমেন্টোস মলিন্স গ্রুপের যৌথ উদ্যোগ লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০০৩ সালে। বর্তমানে কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার ৪০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১ হাজার ৬১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১১৬ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক, ২০ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, দশমিক ৭১ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগকারী ও বাকি ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে। 

গতকাল ডিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ ৬২ টাকায় লেনদেন হয়েছে। গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৫৭ টাকা ৩০ থেকে ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠানামা করেছে।