খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম কমে নয় মাসের সর্বনিম্নে নেমেছে। মূলত খাদ্যশস্যের দুর্বল চাহিদা বাজারকে নিম্নমুখী রাখতে সহায়তা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নমুখী চাহিদা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ সংকটে ভারসাম্য এনেছে।
অনুকূল আবহাওয়ায় যবসহ বিভিন্ন শস্যের সরবরাহ এরই মধ্যে বেড়েছে। অন্যদিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা মূল্যস্ফীতির কারণে পনির থেকে শুরু করে মাংস—সব ধরনের খাদ্যপণ্যের বাণিজ্যেই ভাটা পড়েছে। ফলে কৃষ্ণসাগর থেকে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট কিছুটা শিথিল হয়েছে। সবশেষ গত মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক এক মাসের ব্যবধানে দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। এর মধ্য দিয়ে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম নয় মাসের সর্বনিম্নে নেমেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে উঠেছিল। এতে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে জনজীবন। বিশ্বের সব প্রান্তেই প্রতিটি পরিবার জীবন ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোয় খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম কমতে থাকায় গৃহস্থালিগুলোয় স্বস্তি ফিরছে। টানা সাত মাস ধরে খাদ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী। নয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম এত লম্বা সময় ধরে নিম্নমুখিতা অব্যাহত আছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে প্যারাগুয়ে পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে।
এফএও সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানায়, মাংস, চিনি, ভোজ্যতেল ও দুগ্ধপণ্যের দাম কমেছে। যদিও মূল্যসূচক এখনো সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় বেশ ঊর্ধ্বমুখী। তার ওপর ডলারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বিপদ ডেকে আনছে। বিশেষ করে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে এসব দেশ খাদ্য আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে। তার ওপর রিজার্ভ সংকট তো রয়েছেই।
এদিকে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম কমলেও তা যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্ষেত্রে আরো অনেক সময় লেগে যেতে পারে। উৎপাদকরা এখনো ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানি ও শ্রমিক ব্যয়ের প্রতিবন্ধকতার জালে আটকে আছেন। অন্যদিকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য ও তেলবীজ রফতানি।
এফএও জানায়, গত মাসে সব পণ্যের মধ্যে শুধু খাদ্যশস্যেরই দাম বেড়েছে। সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে করা খাদ্যশস্য রফতানিসংক্রান্ত চুক্তি থেকে সরে আসায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আবারো প্রকট আকার ধারণ করেছে। চলমান অনিশ্চয়তার কারণে গম ও ভুট্টার দাম লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটলে এফএওর খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মার্চে সূচক অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। তবে এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রা সংকোচন নীতির কারণে বাজার আবার নিম্নমুখী হতে শুরু করে। জুলাইয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যে শস্য রফতানিসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাজারদর আরো কমে আসে।
তবে সম্প্রতি রাশিয়া এ চুক্তি সম্প্রসারণের পরিবর্তে সরে আসার ঘোষণা দেয়ায় বাজারে আবারো উদ্বেগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাশিয়ার এ সিদ্ধান্তের কারণে খাদ্যশস্যের সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে। ফলে আবারো আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে নিম্ন আয়ের ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো। সরবরাহ সংকটের কারণে এসব দেশে আগামী বছরের মধ্যেই দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে শীর্ষ খাদ্যশস্য রফতানিকারক দেশ ইউক্রেনের রফতানি আবারো তলানিতে নামার সুযোগ নিতে পারে অন্যান্য শস্যসমৃদ্ধ দেশ। এসব দেশ শস্যের দাম ব্যাপক বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ইউক্রেনের প্রধান ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে শস্য কিনতে বাধ্য হবে।
তথ্য বলছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত ইউক্রেন প্রতি মাসে গড়ে ৬০ লাখ টন খাদ্যশস্য রফতানি করত। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া দেশটিতে হামলা চালালে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর দিয়ে রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। দেশটি তখন থেকে জুলাই পর্যন্ত শুধু স্থল, রেল ও নদীপথে স্বল্প পরিমাণ শস্য রফতানি করতে সক্ষম হয়।










