গ্রিক পুরাণের সিসিফাসকে দেবতারা অভিশাপ দিয়েছিলেন। অনন্তকাল ধরে পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতে হবে বিশাল পাথর। চূড়ায় পৌঁছানোর মুহূর্তেই সেটি গড়িয়ে পড়বে নিচে। আবার শুরু করতে হবে একই সংগ্রাম। অন্যদিকে মেসোপটেমীয় মহাকাব্যের রাজা গিলগামেশ ছুটেছিলেন অমরত্বের সন্ধানে। মৃত্যুকে অস্বীকার করে চেয়েছিলেন সময়ের সীমা অতিক্রম করতে। হাজার বছর পর ফুটবলের সবুজ প্রান্তরে যেন এই দুই পৌরাণিক চরিত্রেরই পুনর্জন্ম হয়েছিল। তার নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। একজন মানুষের শরীরে বাস করত সিসিফাসের অনন্ত সংগ্রাম আর গিলগামেশের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষ। তাকে ড্রিবল করে পেরোনো যায় না। গতির ঝড়ে পেছনে ফেলা যায় না। এমনকি দুর্দান্ত এক বাইসাইকেল কিকেও পরাস্ত করা যায় না। শেষ পর্যন্ত সেই সময়ের কাছেই পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন সিআর সেভেন। ২৩ বছরের পথচলার পর বিদায় জানাচ্ছেন জাতীয় দলকে। ৪১ বছর বয়সী মহাতারকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর শেষ হবে পর্তুগালের হয়ে তার দীর্ঘ অধ্যায়।
অথচ এই মহাকাব্যের শুরুটা ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। ১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরার ফুনশালে জন্মেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরো। বাবা জোসে দিনিস আভেইরো ছিলেন পৌরসভার মালি। স্থানীয় ফুটবল ক্লাবে সরঞ্জাম দেখাশোনার কাজও করতেন। মা মারিয়া দোলোরেস অন্যের বাড়িতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছেন, রান্নার কাজ করেছেন। চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানোই ছিল প্রতিদিনের সংগ্রাম। ছোট্ট ঘরে ভাইবোনদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা ছেলেটির জীবনে বিলাসিতা ছিল দূরতম কল্পনা।
দারিদ্র্যের সঙ্গে ছিল বাবার মদ্যপানের সমস্যা, সংসারের টানাপড়েন আর অনিশ্চয়তা। অথচ সেই অভাবের মধ্যেই একটি ফুটবল হয়ে উঠেছিল ছেলেটির সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলা শেষে ঘরে ফিরত, ক্রিস্টিয়ানো তখনো বল নিয়ে ছুটতেন। যেন তার সামনে অদৃশ্য কোনো গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে ছিল, যেটি অতিক্রম করতেই হবে।
প্রথমে আন্দোরিনহা, পরে নাসিওনাল। মাত্র ১২ বছর বয়সে মাদেইরা ছেড়ে লিসবনের স্পোর্টিং একাডেমিতে যোগ দেন রোনালদো। মায়ের স্নেহ, পরিচিত রাস্তা, শৈশবের বন্ধুবান্ধব ফেলে এক অচেনা শহরে। সেখানেও অপেক্ষা করছিল নতুন পরীক্ষা। মাদেইরার উচ্চারণ নিয়ে সহপাঠীদের বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছে। একাকিত্বে কেঁদেছেন। বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু ফিরে যাননি। সম্ভবত সেখানেই জন্ম নিয়েছিল রোনালদোর ভেতরের সেই সিসিফাস। যে জানত, পাথর আবার গড়িয়ে পড়বে। তবু পাহাড়ে ওঠা বন্ধ করা যাবে না।
২০০৩ সালে স্পোর্টিং লিসবনের এক তরুণ উইঙ্গারকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে এসে রোনালদো পেলেন কিংবদন্তি জর্জ বেস্ট, এরিক কাঁতোনা ও ডেভিড বেকহামের স্মৃতিবিজড়িত সাত নম্বর জার্সি। সেই জার্সির ভার বহনের সামর্থ্য আছে কি না, শুরুতে প্রশ্ন উঠেছিল। উত্তর দিতে বেশি সময় নেননি তিনি।
ম্যানচেস্টারে জিতেছেন তিনটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ২০০৮ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ। একই বছর প্রথম ব্যালন ডি’অর। এরপর ২০০৯ সালে পাড়ি জমালেন রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানেই যেন পূর্ণতা পেল ফুটবলের এক দুর্দমনীয় সম্রাটের উত্থান।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ৯ মৌসুমে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫১ গোল। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটি লা লিগা, অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পাঁচবারের চারবারই ইউরোপসেরা হলো রিয়াল। সব মিলিয়ে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৪০ গোলের রেকর্ডও তার। এক মৌসুমে ১৭ গোলের কীর্তি আজও অক্ষত।
কিন্তু রোনালদোর মহত্ত্ব কেবল সংখ্যায় নয়। তার গল্পে আছে ২০১৮ সালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে প্রায় অবিশ্বাস্য সেই বাইসাইকেল কিক। আছে ম্যানচেস্টারের বৃষ্টিভেজা রাত, মাদ্রিদের উন্মত্ত গ্যালারি। আছে ইতালির জুভেন্টাসে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, আবার ম্যানচেস্টারে প্রত্যাবর্তন। ক্যারিয়ারের শেষভাগে সৌদি আরবের আল নাসরেও থামেনি গোলের ক্ষুধা। ২০২৪ সালে পেশাদার ফুটবলে ৯০০ গোলের মাইলফলক পেরিয়েছেন। এখন হাজার গোলের অসাধারণ উচ্চতার দিকে ছুটছেন।
এই যাত্রায় তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিও ছিলেন অনিবার্য এক অধ্যায়। ফুটবলবিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্কে। একজনের খেলায় ছিল সহজাত জাদু, অন্যজন যেন নিজের শরীরকে নির্মাণ করেছিলেন কঠোর পরিশ্রমের গবেষণাগারে। তবে ক্লাব ফুটবলের এতসব সাফল্যের পরও তার সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়টির নাম পর্তুগাল।
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক। পরের বছর ঘরের মাঠে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে গ্রিসের কাছে হেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ১৯ বছরের রোনালদো। সেদিনের সেই অশ্রু যেন তার জীবনে এক অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা হয়ে রইল।
১২ বছর পর, ২০১৬ সালের ১০ জুলাই। প্যারিসের স্তাদ দ্য ফ্রান্স। ইউরোর ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ফ্রান্স। কিন্তু খেলার শুরুতেই দিমিত্রি পায়েতের সঙ্গে সংঘর্ষে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হলো পর্তুগিজ অধিনায়ককে। স্ট্রেচারে শুয়ে আবার কাঁদলেন রোনালদো। যে শিরোপার জন্য এত বছরের অপেক্ষা, সেটি জয়ের শেষ লড়াইয়ে নিজেই থাকতে পারলেন না!
অথচ ভাগ্য সেদিন লিখেছিল অন্য এক সমাপ্তি। অতিরিক্ত সময়ে এদেরের গোলে চ্যাম্পিয়ন হলো পর্তুগাল। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দেয়া রোনালদো এবার কাঁদলেন আনন্দে। ২০০৪ সালের হতাশ কিশোর ২০১৬ সালে হয়ে উঠলেন ইউরোপজয়ী অধিনায়ক। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে দুবার উয়েফা নেশনস লিগ জয়। দেশের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল—পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড। ছয়টি ইউরো ও ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তিও তার। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে সর্বাধিক গোলদাতাও তিনি।
অথচ এত অর্জনের মধ্যেও একটি শূন্যতা রয়ে গেছে। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি কখনো তার হাতে ওঠেনি। ২০০৬ সালে সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পর বিশ্বমঞ্চে আর শেষ চারে উঠতে পারেননি রোনালদো। ২০২৬ বিশ্বকাপও শেষ হয়েছে অপূর্ণতা নিয়ে। গিলগামেশের মতোই যেন সবকিছু জয় করেও একটি অধরা স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাকে।
জীবনের ব্যক্তিগত বেদনাও কম ছিল না। ২০০৫ সালে বাবাকে হারিয়েছেন, যখন নিজের ফুটবল প্রতিভার পূর্ণ বিকাশই ঘটেনি। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠা, ব্যালন ডি’অর হাতে নেয়া কিংবা দেশের হয়ে ইউরোপ জয়—কোনোটিই দেখে যেতে পারেননি বাবা। ২০২২ সালে নবজাতক পুত্রসন্তান হারানোর শোকও সহ্য করতে হয়েছে। কোটি মানুষের উল্লাসে ঘেরা মানুষটির জীবনেও ছিল এমন সব নীরব অন্ধকার, যেখানে কোনো করতালি পৌঁছায় না।
বিদায়ী বার্তায় রোনালদো বলেছেন, জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি কখনো একার মনে করেননি। এটি পর্তুগালের সবার। ২৩ বছর ধরে সেই জার্সি পরার সুযোগ পাওয়াই তার জীবনের বিরাট সম্মান। আরো বলেছেন, গোল একদিন হারিয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি হয়, সময় সেটি মুছে ফেলতে পারে না। কত গভীর উপলব্ধি! যে মানুষটি সারাজীবন সংখ্যার পর সংখ্যা যোগ করেছেন নিজের নামের পাশে, বিদায়ের মুহূর্তে তিনিই বলছেন, সংখ্যাই শেষ কথা নয়।
আলবেয়ার কামু তার সিসিফাসকে কল্পনা করেছিলেন সংগ্রামের মধ্যেই নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পাওয়া মানুষ হিসেবে। রোনালদোর জীবনও যেন সেই দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি জয় ছিল নতুন পাহাড়ের সূচনা। প্রতিটি রেকর্ডের পর তার সামনে হাজির হয়েছে আরেকটি রেকর্ড। কখনো তৃপ্ত হননি। কখনো থামতে চাননি। কিন্তু গিলগামেশের মতো তাকেও শেষ পর্যন্ত সময়ের অনিবার্যতা মেনে নিতে হচ্ছে। জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখছেন, যদিও ক্লাব ফুটবলে তার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।
হয়তো একদিন আল নাসরের জার্সিটিও খুলে রাখবেন। স্তব্ধ হয়ে যাবে তার বিখ্যাত ‘সিউউ’ উদ্যাপনের প্রতিধ্বনি। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন অন্য কোনো তরুণ। নতুন সম্রাটের অভিষেক হবে, নতুন মহাকাব্য রচিত হবে সবুজ প্রান্তরে। সময়ের নির্মম স্রোতে ভেঙে যাবে রেকর্ড, ধুলো জমবে ট্রফির গায়ে, বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে অসংখ্য বিজয়গাথা। কিন্তু ইতিহাসের সবকিছু কি মুছে ফেলা যায়? ট্রয়ের প্রাচীর আজ নেই, তবু অ্যাকিলিস বেঁচে আছেন হোমারের মহাকাব্যে।
গিলগামেশ একদিন বুঝেছিলেন, মৃত্যুকে জয় করা যায় না। অমরত্বের সন্ধানে পৃথিবীর প্রান্তে ছুটেও শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হয়েছিল উরুকের প্রাচীরের কাছে। সেখানেই ছিল তার রেখে যাওয়া কীর্তির সাক্ষ্য। রোনালদোর যৌবন ফুরিয়েছে, শরীরের গতি বদলেছে, তবু থামেনি শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষুধা। কিন্তু একদিন তাকেও মাঠ ছাড়তে হবে। তখন কেবল গোলের সংখ্যা, ব্যালন ডি’অর কিংবা সোনালি ট্রফি দিয়ে মাপা হবে না তার জীবন। মাপা হবে মাদেইরার এক দরিদ্র কিশোরের স্বপ্ন কত মানুষের জীবনে অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস জুগিয়েছে, তা দিয়ে।















