না, আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলতে আসিনি। আমি এক কিংবদন্তির কথা বলছি। এমন একজনের কথা বলছি, যিনি আমার পূর্বপুরুষ নন, আমার স্বজনও নন; অথচ তার জন্য বুকের ভেতর জমে আছে এক অদ্ভুত ভালোবাসা। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ফুটবল মাঠের এক বিস্ময়, একটি প্রজন্মের আবেগ, কোটি মানুষের স্বপ্নের নাম।

ফুটবল শুধু গোল, জয় কিংবা ট্রফির হিসাব নয়। কখনো কখনো একজন ফুটবলার হয়ে ওঠেন একটি দেশের পরিচয়, কোটি মানুষের আবেগ আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তেমনই একজন। পর্তুগাল, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবা জুভেন্টাসের জার্সি গায়ে তার প্রতিটি গোল, উদযাপন, লড়াই কিংবা অশ্রু ছুঁয়ে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের। তাই পর্তুগালের জার্সিতে তার দীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়, আমার মতো অসংখ্য সমর্থকের কাছে আবেগের একটি অধ্যায়ের শেষ।

পর্তুগালের জার্সি শুধু গায়ে জড়াননি রোনালদো, কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন পুরো একটি জাতির আশা ও স্বপ্ন। দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন, সমালোচনা সহ্য করেছেন, ব্যর্থতার গ্লানি পেরিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিটি মুহূর্তে নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছেন দেশের জন্য। কখনো চোখের জলে ভিজেছে তার মুখ, কখনো বিজয়ের উল্লাসে কেঁপেছে স্টেডিয়াম। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি ছিলেন পর্তুগালের এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয়।

ফুটবলকে দেয়া প্রতিটি মুহূর্তের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, সিআর সেভেন। আর এ কৃতজ্ঞতা কেবল তোমার অর্জনের জন্য নয়, ফুটবলকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখানোর জন্যও। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষ তোমার বেড়ে ওঠা দেখেছে, তোমার গোলের সঙ্গে আনন্দে মেতেছে, কঠিন সময়ে তোমার লড়াই থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে। প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে অদম্য চেষ্টা, তা আমাদের কাছে শুধু ফুটবলের শিক্ষা হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে জীবনেরও পাঠ।

1

তোমার ক্যারিয়ার আমাদের শিখিয়েছে, শুধু প্রতিভা দিয়ে শীর্ষে পৌঁছানো যায় না। প্রয়োজন শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, ত্যাগ এবং নিজের ওপর অবিচল বিশ্বাস। চারপাশের মানুষ যখন সন্দেহ করেছে, তখনো নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে গেছো। বয়স, প্রতিকূলতা কিংবা সমালোচনা, কোনোটিই তোমাকে দমাতে পারেনি। প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে নিয়েছো নিজেকে নতুন করে প্রমাণের উপলক্ষ হিসেবে।

পর্তুগালের হয়ে তোমার যাত্রায় জমা হয়েছে কত শত স্মৃতি! ২০১৬ সালের ইউরো জয়, ২০১৯ সালের উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবিশ্বাস্য গোল, প্রত্যাবর্তন, আবেগঘন উদযাপন সবকিছুই ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। সে স্মৃতির কোথাও আছে আনন্দে ভিজে যাওয়া চোখ, কোথাও পরাজয়ের বেদনা, কোথাও অধিনায়কের বাহুতে জড়িয়ে থাকা একটি দলের স্বপ্ন। তুমি শুধু ট্রফি জেতোনি, একটি জাতিকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছো যে তারাও ইউরোপের সেরা হতে পারে।

তোমার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো গোল কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তোমার প্রকৃত উত্তরাধিকার ছড়িয়ে আছে সেই লাখো মানুষের মধ্যে, যারা তোমাকে দেখে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। একটি প্রজন্মকে তুমি বিশ্বাস করতে শিখিয়েছো—ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

পর্তুগালের প্রতি আমার ভালোবাসার গল্পটাও একটু অন্য রকম। সত্যি বলতে, আমি অন্য একটি দলে বড় ফ্যান। সেই ছোটবেলা থেকেই ওই দলকে সমর্থন করি। কিন্তু দ্বিতীয় দল হিসেবে পর্তুগালের সমর্থক হওয়ার পেছনে আমার সবচেয়ে বড় কারণ তুমি। তোমার জন্যই পর্তুগালের খেলা দেখেছি, তোমার গোলের জন্য অপেক্ষা করেছি, তোমার জয়ের আনন্দে মেতেছি। তাই তোমার বিদায়ের সঙ্গে যেন পর্তুগালের প্রতি আমার সমর্থনেরও চুক্তি শেষ হয়ে গেল। আমি শুধু সে দলকেই সমর্থন করি, যেখানে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো খেলেন। তুমি যখন পর্তুগালের জার্সি ছেড়ে চলে যাচ্ছ, আমিও যেন সেই জার্সির প্রতি আমার সমর্থন ফিরিয়ে নিচ্ছি।

2

কথাটি হয়তো কারো কাছে নিছক আবেগ কিংবা রসিকতা মনে হবে। কিন্তু আমার কাছে এটাই সত্য। আমার কাছে পর্তুগাল মানেই রোনালদো। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ফুটবল দেখার অভ্যাস, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, অভিমান আর অসংখ্য স্মৃতি। যে মানুষটির জন্য একটি দলকে ভালোবেসেছি, তার বিদায়ের পর সে দলের প্রতি আগের মতো আবেগটা ধরেই বা রাখব কীভাবে?

অবশ্য ফুটবল থেমে থাকবে না। নতুন কিংবদন্তি তৈরি হবে। কিন্তু তুমি থাকবে তোমার জায়গায়। কারণ কিংবদন্তিরা কেবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেন না, তারা হৃদয়েও স্থায়ী ঠিকানা গড়ে নেন।

তাই আজ কোনো পরিসংখ্যানের হিসাব করতে চাই না। কত গোল, কত ম্যাচ, কত ট্রফি—সেসবের বাইরেও তুমি অনেক বড় কিছু। তুমি আমার মতো অসংখ্য মানুষের ফুটবল ভালোবাসার কারণ। পর্তুগালের জার্সি হয়তো তোমার শরীর থেকে নেমে গেছে, কিন্তু আমাদের হৃদয় থেকে তোমার বিদায় নেই।

ধন্যবাদ, ক্রিস্টিয়ানো। সবকিছুর জন্য।

তুমি চিরকাল কিংবদন্তি। চিরকাল ‘সিআর সেভেন’।