স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তরুণদের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন যুব সংগঠনের প্রতিনিধি, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে তরুণদের ভাবনা, চাহিদা ও অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করা সহজ হবে। এভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ মে) ঢাকার একটি হোটেলে ‘গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জন–আকাঙ্ক্ষার আলোকে স্থানীয় সরকার সংস্কার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। গভার্নেন্স অ্যাডভোকেসি ফোরাম ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথভাবে আয়োজিত এ সভায় সহায়তা করে বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ–নির্বাহী পরিচালক নাসিফা আলী ও ইউএনডিপির ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যানালিস্ট সাওসান সুহা। সভার সঞ্চালনা করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ–পরিচালক কানিজ ফাতেমা।
সভায় অংশ নেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিওয়াইএলসি, ইয়ুথ এসেম্বলি, ইয়েস গ্রুপ, ওয়াইএএসডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটিসহ আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যুব প্রতিনিধিরা। তারা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে নানা প্রস্তাব তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক ও ফোরামের ফ্যাসিলিটেটর অনিরুদ্ধ রায়। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের ৫১টি সুপারিশের মধ্যে ২৫টি সুপারিশ গভার্নেন্স অ্যাভোকেসি ফোরামের সুপারিশের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ বা একমত/আংশিক একমত। ২৩টি সুপারিশ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন ও ৩টি বিষয়ে ফোরামের ভিন্নমত রয়েছে। এ তিনটি বিষয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকারের কাঠামো, পরিষদের সদস্য নিয়োগ পদ্ধতি ও জেলা পরিষদের নির্বাচন ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাব ও জেলা পরিষদকে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব ফোরামের সংস্কার ভাবনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এতে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি হবে। সেই সঙ্গে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যুব ও নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে তরুণদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। বর্তমান সময়েও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে তারাই অগ্রণী।
সভায় অংশ নেয়া যুব প্রতিনিধিরা স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। তারা বলেন, মেগা সিটিগুলোর জন্য আলাদা স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে। স্থানীয় সরকারের বাজেট স্থানীয় পর্যায়ে হস্তান্তর করতে হবে আর সেই বাজেটের ব্যবহারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ই-গভর্নেন্স কার্যকর করতে হবে, নাগরিক সনদ চালু করে নাগরিকদের অধিকার ও সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা আরো বলেন, দলিত তরুণদের জন্য আলাদা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে সেনামুক্ত নির্বাচনের ব্যবস্থা করে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের পরিবর্তে নির্দলীয় পদ্ধতিতে ফেরার দাবি জানানো হয়। পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামোর সমন্বয় কীভাবে হবে, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করতে হবে।
তারা বলেন, তরুণদের ছায়া নেতৃত্ব তৈরিতে কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। স্থানীয় সরকার যাতে সম্পদের দিক থেকে স্বনির্ভর হতে পারে, সেজন্য যথাযথ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বছরভিত্তিক জন আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আদিবাসী তরুণদের নেতৃত্বে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১০ সালে তারা ‘ইয়ুথ প্লাটফর্ম’ গঠন করে যা ২০১৫ সালে ‘ইয়ুথ এসেম্বলি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি তরুণদের অধিকার, ক্ষমতায়ন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে নাসিফা আলী বলেন, তরুণরাই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। ওয়েভ ফাউন্ডেশন ৩৫ বছর ধরে সুশাসন, অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ‘গভার্নেন্স অ্যাডভোকেসি ফোরাম’ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে বিভিন্ন স্তরে কাজ করছে।
ইউএনডিপির সাওসান সুহা বলেন, দেশের সংকটময় মুহূর্তে তরুণরা সব সময় এগিয়ে আসে। তাই নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সভায় বক্তারা বলেন, স্থানীয় সরকার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, সামাজিক নিরীক্ষা ও নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, অংশগ্রহণমূলক শাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত না হলে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর কর্মসূচির অংশ হিসেবেও স্থানীয় সরকার সংস্কারের এজেন্ডা রাখা উচিত। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি রাখার আহ্বান জানানো হয়। —বিজ্ঞপ্তি










