‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের গুরুত্ব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (২৫ জুন) সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে এডিডি ইন্টারন্যাশনালের কৌশলগত সহায়তায় বি-স্ক্যান, এনজিডিও, এনসিডিডব্লিউ ও ডিডব্লিউএস-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি পার্টিসিপেটরি গ্র্যান্টস মেকিং (পিজিএম) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হয়।

সভা সঞ্চালনা করেন বি-স্ক্যান এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব। তিনি দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন সংগঠনের একত্রে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে ভালো কাজ করা এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা রাখে—এমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর (ওপিডি) একটি জাতীয় ম্যাপিংয়ের গুরুত্বের কথা বলেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জেপিইউএফ এই উদ্যোগ নিতে পারে বলে বলে মত দেন তিনি।

ডিডব্লিউএস এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, মর্জিনা আহমেদ তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, আইনগুলো ঘুমন্ত অবস্থায় আছে, এগুলোর কথা কেউ জানে না। আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা-সেমিনারে যুক্ত হতে চাচ্ছি যাতে এ জনগোষ্ঠী উপকৃত হতে পারে।

বি-স্ক্যান এর পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের কোন ধরনের সংগঠনের কোন দক্ষতা রয়েছে বা কোন কোন ক্ষেত্রে কাজ করে তার কোনো তথ্য নেই। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়গুলো সেভাবে বিবেচনায় ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগেুলোকে (ওপিডি) শুধুমাত্র ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ে নয়, ক্যাটালিস্টের ভূমিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনজিডিও এর সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান। তিনি এ পর্যায়ে নিম্নে উল্লেখিত সুপারিশগুলো উপস্থাপন করেন- –

মূল ধারার উন্নয়ন সংগঠনগুলোর কাজে কৌশলগত বা বাস্তবায়নকারী সংগঠন হিসেবে অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করা।

সব ধরনের উন্নয়ন প্লাটফর্ম বা নেটওয়ার্কে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে যুক্ত করা।

সব ধরনের উন্নয়ন সংস্থার আয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোকে দাওয়াত দেয়া।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনে অনুদানকৃত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাৎসরিক তথ্য প্রকাশ করা।

উল্লেখযোগ্য অনুদান দেয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পুরষ্কৃত করা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাইরে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে যুক্ত করা ও অনুদানের ব্যবস্থা করা।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অনুদান ২-৩ বছরের পরিবর্তে প্রতি বছর দেয়া।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে অনুদান দেয়া।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এডিডি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ প্রোগ্রাম লিড গোলাম ফারুক হামিম, বলেন,
‘দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ক বহু আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। তীব্র মাত্রার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জরুরি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি গবেষণা সেল গঠন ও অর্জনযোগ্য স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানাই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি স্মার্ট কার্যকরী এবং স্বল্পমেয়াদি বা তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে ফলপ্রসূ হবে।’

সিবিএম গ্লোবাল বাংলাদেশের দেশস্থ পরিচালক মো. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধী মানুষের পূর্ণমাত্রায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এককভাবে কিছু করতে পারব না, যারা মেইনস্ট্রিম অরগানাইজেশনগুলো আছে তারা কীভাবে তাদের কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়টাকে অন্তর্ভুক্ত করছেন সেটা দেখা দরকার, তাহলেই কিন্তু সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।’

সাইটসেভার্সের দেশস্থ পরিচালক অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী সেবায় কার্যকর সমন্বয়ের জন্য ম্যাপিংয়ের পাশাপাশি ট্র্যাকিং অত্যাবশ্যক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবায় দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারের একটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে লিডারশিপ গ্রহণের মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করতে হবে। জেলা পর্যায়ের প্রতিবন্ধী কমিটিগুলোকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা জরুরি। গ্রাসরুট পর্যায়ের ওপিডিগুলো মূল ভূমিকা পালন করলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সরকারের দায়িত্ব বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণও অপরিহার্য।’

সিএসআইডি নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, ‘করোনা মহামারি, রোহিঙ্গা সংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ ডোনারদের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ওপিডিগুলো অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়বদ্ধতা আরো বেড়েছে। সরকারের অর্থ অপচয় ও দুর্নীতিরোধ করলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সঠিকভাবে অর্থ বরাদ্দ করা যাবে। শুধুমাত্র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নয় এ ‘‘রুলস অব বিজনেস’’ এর মাধ্যমে অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (জেপিইউএফ) পরিচালক (প্রশাসন, অর্থ, অডিট ও কার্যক্রম) উপসচিব ফজলে ছিদ্দীক মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন কারিগরি কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়েছে। সাইটসেভার্সের সহযোগিতায় ওপিডিগুলোর একটি জাতীয় ম্যাপিং শিগগিরই সম্পন্ন করা হবে। জেপিইউএফের আটটি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে থেকে সাতটি বিষয়ের ওপর ওপিডিগুলোর সঙ্গে কর্মশালা আয়োজন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যতের জন্য কর্মপরিকল্পনা ও ইনোভেটিভ আইডিয়ার ভিত্তিতে ফান্ড প্রদান বিষয়ে আলোচনা হবে।’

তিনি ওপিডিদের একটি জাতীয় প্লাটফর্ম গঠনের অনুরোধ জানান, যা ওপিডিগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জুলাই মাসের বিপ্লবের পর এটি একটি সুযোগ এবং জেপিইউএফ মন্ত্রণালয়কে আলাদা অধিদপ্তর গঠনের সুপারিশ করেছে বলে তিনি জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘আইন ও বিধিমালা নিয়ে শুধুমাত্র দিবসগুলোতেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কমিটিগুলোকে ছোট ও কার্যকর করে সদস্যদের সক্রিয় করা প্রয়োজন।’ কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি সেল উদ্বোধন করা হবে খুব শিগগির। মন্ত্রণালয় থেকে রোগী কল্যাণ সমিতিতে আয়কর রেয়াত করা হয়েছে।’ আগামী বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ আরো দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং আগামী বছরের মধ্যে ওপিডিগুলোর ম্যাপিং করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এনসিডিডব্লিউ এর সহ-সভাপতি মোছা. রোকেয়া বেগম সভায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের সময় তারা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এ অসুবিধাগুলো দূর করার জন্য সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সকল কর্মসূচি ও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের বাংলা ইশারা ভাষার দোভাষী আরিফুল ইসলাম অনুষ্ঠানজুড়ে ইশারা ভাষার দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেন। —বিজ্ঞপ্তি