প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ নির্ধারিত খাতে ও সময়ের মধ্যে ব্যবহার না করা এবং অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগে সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ১১ জনকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসির এক বিজ্ঞপ্তিতে কোম্পানিটির আইপিওর অর্থ ব্যবহারে বিভিন্ন অসংগতির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

জরিমানার আওতায় আসা ব্যক্তিরা হলেন কোম্পানির চেয়ারম্যান নাসিম সিকদার, ভাইস চেয়ারম্যান মামতাজুল হক সিকদার, পরিচালক লিসা ফাতেমা হক সিকদার, মোহতাসিম বিল্লাহ খান, মনিকা সিকদার খান, জোনাস সিকদার খান, সালাহ উদ্দিন খান, জেফরি খান সিকদার, ম্যান্ডি খান সিকদার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আবদুর রফিক ও কোম্পানি সচিব আবদুর রাজ্জাক।

নথি অনুযায়ী, সিকদার ইন্স্যুরেন্স আইপিওর মাধ্যমে ১৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, সংগৃহীত ১৬ কোটি টাকা তিন মাসের মধ্যে নির্ধারিত খাতে ব্যবহারের কথা ছিল। এর মধ্যে ৪ কোটি টাকা এফডিআর, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, ৬ কোটি ৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা ফ্লোর কেনা এবং ১ কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকা আইপিও-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল।

বিএসইসির পরিদর্শনে দেখা যায়, এফডিআরে বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত ৪ কোটি টাকার পরিবর্তে কোম্পানিটি মোট ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। নয়টি ব্যাংকে এসব অর্থ জমা রাখা হয়। কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অধিকতর বিনিয়োগ আয় পাওয়ার উদ্দেশ্যে আইপিও ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ থেকে ২০ লাখ টাকা এফডিআরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে বিএসইসি বলেছে, এ ধরনের উদ্দেশ্য বা সময়ের পরিবর্তনের আগে অন্তত ৫১ শতাংশ পাবলিক শেয়ারহোল্ডারের অনুমোদন নেয়ার বিধান থাকলেও তা নেয়া হয়নি।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার মধ্যে কোম্পানি প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। এ বিনিয়োগ করা হয় ই-সিকিউরিটিজ লিমিটেড ও আইডিএলসি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মাধ্যমে।

১ জানুয়ারি ২০২৫ এসব বিনিয়োগের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ফলে বরাদ্দ করা অর্থের ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল। কোম্পানি এর কারণ হিসেবে ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকটের কথা উল্লেখ করে। নথিতে বলা হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের ওয়েস্ট ধানমন্ডি শাখা ১৪ নভেম্বর ২০২৪ কোম্পানিকে জানায়, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য দেয়া দুটি চেকের মোট ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ৪০ লাখ টাকার একটি পে-অর্ডারও ব্যাংকে আটকে ছিল।

অন্যদিকে, ফ্লোর কেনার জন্য বরাদ্দ ৬ কোটি ৮ লাখ ৭১ হাজার টাকার পুরো অর্থই নির্ধারিত সময়ে ব্যবহার করা হয়নি। কোম্পানির বক্তব্য অনুযায়ী, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যবসায়িক স্থান পাওয়া যায়নি এবং বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের বিবেচনাধীন ছিল। বিএসইসি বলেছে, বরাদ্দ করা অর্থের ১০০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকায় কোম্পানিকে একদিকে অফিস ভাড়া বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে, অন্যদিকে ওই অর্থ অব্যবহৃত থাকার কারণে সুযোগ ব্যয়ও হয়েছে। তবে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ সালের সভায় ফ্লোর কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ অনুষ্ঠিত ১১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।

আইপিও ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ১ কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকার মধ্যে কোম্পানি ব্যয় করেছে ৯০ লাখ টাকা। নথিতে বলা হয়েছে, অব্যবহৃত অর্থের মধ্যে ২১ লাখ টাকা এফডিআরে বিনিয়োগ করা হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংকে রাখা হয়। আইপিও ব্যয়ের ৯০ লাখ টাকার মধ্যে ইস্যু ব্যবস্থাপকের ফি, বিএসইসির আবেদন ও সম্মতিপত্র ফি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন ফি, সিডিবিএল ফি, আন্ডাররাইটিং কমিশন, নিরীক্ষকের প্রত্যয়ন ফি, সংবাদপত্রে প্রসপেক্টাস ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, প্রসপেক্টাস মুদ্রণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সফটওয়্যার এবং প্রশাসনিক ও স্টেশনারি ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়।

বিএসইসি তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, আইপিওর অর্থ প্রসপেক্টাসে নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার বা নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যবহার করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এক্ষেত্রে অন্তত ৫১ শতাংশ পাবলিক শেয়ারহোল্ডারের পূর্বানুমোদন নেয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের মতে, সিকদার ইন্স্যুরেন্স এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি। ফলে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে কোম্পানিটি আইপিও সম্মতিপত্রের পার্ট সির শর্ত ৬ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২(সিসি) ধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্য করেছে।

কোম্পানির পক্ষ থেকে দেয়া ব্যাখ্যায় ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে অর্থ ব্যবহারে বিলম্ব এবং অব্যবহৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা বলা হয়। তবে বিএসইসি কোম্পানির ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। এ কারণে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২২ ধারায় ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংশ্লিষ্ট ১১ ব্যক্তি প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।