দুই বছর ধরে দেশে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি বজায় রয়েছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে মুদ্রাবাজারে অর্থের সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ফলে আমানতের সুদহার কমার সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহের ক্ষেত্রেও চাপ থাকবে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
গতকাল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ‘মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে। নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ও সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)। বর্তমানে এসএলএফ ও এসডিএফের সুদহার যথাক্রমে ১০ ও ৭ শতাংশ। তারল্যের প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। আর রিভার্স রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। রেপো রেটকে নীতি সুদহার নামে অভিহিত করা হয়।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে দেশে ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে ঠেকেছে। পাশাপাশি বেড়েছে আমানতের সুদহারও। ক্ষেত্রবিশেষে দুই অংকের সুদও মিলছে আমানতের বিপরীতে। এ অবস্থায় ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে অনেকেই পুঁজিবাজারের তুলনায় ব্যাংকে আমানত রাখার দিকে ঝুঁকছেন। এতে করে তারল্য সংকটে পড়েছে পুঁজিবাজার। এ অবস্থায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকার কারণে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রভাবের ক্ষেত্রে চাপ থাকবে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বণিক বার্তাকে বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকলে এবং সুদের হারে ঊর্ধ্বমুখিতা বজায় থাকলে পুঁজিবাজারে তো এর প্রভাব পড়বেই। সুদ হার না কমলে পুঁজিবাজারের তুলনায় বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউ ব্যাংকে আমানত রাখাকেই বেশি নিরাপদ মনে করতে পারেন।
এবারের মুদ্রানীতিতে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের জোগান দিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। আর সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হবে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশের পুঁজিবাজারে এ বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই নিম্নমুখিতা দেখা যাচ্ছে। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও ক্রমে নিম্নমুখী। গত জুনে এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে কম লেনদেন হয়েছে। এ সময় গড়ে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছে। এর আগের মাস মে’তে লেনদেন হয়েছিল ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
অবশ্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাব যা পড়ার সেটি এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে নতুন করে আর প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে নতুন করে পুঁজিবাজারে প্রভাব রাখার মতো কিছু নেই। মুদ্রনীতির বেশকিছু বিষয় অপরিবর্তিত থাকার কারণে পুঁজিবাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।
তাছাড়া এ বছরের এপ্রিলে ৪ কোটি ৭০ লাখ, মার্চে ৫ কোটি ৪০ লাখ, ফেব্রুয়ারিতে ১১ কোটি ৫০ লাখ ও জানুয়ারিতে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছিল। গত বছরের জুনে পুঁজিবাজারে গড়ে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছিল। গত বছরের জুলাইয়ে ৭ কোটি ২০ লাখ, আগস্টে ৪ কোটি, সেপ্টেম্বরে ৫ কোটি ৭০ লাখ, অক্টোবরে ৪ কোটি ২০ লাখ নভেম্বরে ৩ কোটি ৯০ লাখ এবং গত ডিসেম্বরে পুঁজিবাজারে ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছিল।










