ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ একটি ব্যস্ততম মহাসড়ক। মহাসড়কটি ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বারও বলা চলে। বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশের প্রায় পুরোটাজুড়েই রয়েছে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কলকারখানা। এসব কারখানার মালামাল পরিবহনের জন্য বিপুলসংখ্যক ভারী যানবাহন সড়কে চলাচল করে। চলাচল করে বিপুলসংখ্যক আন্তঃজেলা পরিবহনও। শুধু যানবাহন নয়, দুই পাশে কলকারখানার প্রভাবে এ মহাসড়কে পথচারীও বেশি। শ্রমিকরা হেঁটে যাতায়াত করেন ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য। কিন্তু ফুটপাত দখল করে ভাসমান দোকান নির্মাণ করায় এবং যানজটের কারণে জনসাধারণকে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে ও যানজট নিরসনের উদ্দেশ্য সামনে রেখে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিগত সরকার। যানজট তো কমেইনি উল্টো ভুল পরিকল্পনা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে গাজীপুর-বিমানবন্দর মহাসড়কে তীব্র যানজটে জনগণের ভোগান্তি বেড়েছে।

বিআরটি লেন ও স্টেশন নির্মাণের পর দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পের ভৌতকাজ এখন শেষের পথে। করিডোরটিতে যানজট আরো বেড়েছে। দিনের ব্যস্ততম সময়ে করিডোরের ২০ কিলোমিটার অংশ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ২-৩ ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ও যানজট নিরসনে বিআরটি করিডোরটি সব যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত রাখাই উচিত হবে। সেখানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ না করাই উত্তম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশায় ভুল থাকার কারণে স্টেশন বানাতে গিয়ে স্টেশন এলাকায় সড়ককে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। ফলে স্টেশন এলাকা পার হওয়ার সময় গতি কমিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে যানবাহন। ধীরগতির মধ্যে গাড়ির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিচ্ছে যানজট। বিআরটি করিডোরে পরিষেবা শুরু না হওয়ায় আপাতত বিভিন্ন পয়েন্টে ছয়টি লেনই ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে সব যানবাহন। কিন্তু পরিষেবা শুরুর পর এসব যানবাহনের জন্য বিআরটি লেন পুরোপুরি বন্ধ করা হলে এ পথে যানজট আরো তীব্র হবে। অর্থাৎ প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে ভুল নকশায়। যেসব লক্ষ্য সামনে রেখে এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, ভুল নকশার কারণে তা ভেস্তে গেছে। রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভার হিসেবে মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। শহরের প্রধান ব্যস্ততম সড়ক হওয়ায় এর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ থাকলেও ফ্লাইওভার নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে এর নকশায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। অবশেষে ভুল নকশায় নির্মিত ফ্লাইওভারটি ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ফ্লাইওভারে ওঠা ও নামার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঢাল ও উচ্চতা বজায় রাখতে না পারায় ফ্লাইওভারটি যানজট নিরসনে তেমন কোনো কাজে আসেনি। একইভাবে মহাখালী ফ্লাইওভারেও নকশাগত ত্রুটির কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। খিলগাঁও ফ্লাইওভার চালুর কয়েক বছরের মাথায় বড় ধরনের ফাটল দেখা গিয়েছিল। যমুনা সেতুতেও বড় ফাটল দেখা দেয়ার পর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তা মেরামত করা হয়েছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর নির্মাণ পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটির কারণে অদূরভবিষ্যতে এসব স্থাপনাও ভেঙে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে নগরবিদদের কেউ কেউ মনে করেন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একেকটি স্বপ্নের স্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনা, অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট। ত্রুটি ধরা পড়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি।

দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার আগে একাধিক দফায় প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধন করতে হয়েছে। তার পরও একের পর এক ত্রুটি উন্মোচিত হচ্ছে। এ রকম ত্রুটি ও ভুল পরিকল্পনায় প্রায় ১৩ বছর ধরে চলছে প্রকল্পটি। দফায় দফায় বাড়াতে হচ্ছে মেয়াদ ও খরচ। এক্ষেত্রে নকশাগত ত্রুটি, পরিকল্পনাগত দুর্বলতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের আগে আরো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন ছিল।

বিআরটির মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত দুই-চার বছর লাগে। এর ব্যয়ও হয় কম। কিন্তু বিমানবন্দর-গাজীপুর প্রকল্পে উড়ালসড়ক, পাতালপথ, সেতুসহ অন্যান্য কাজ যুক্ত করে এটি জটিল করা হয়েছে। ট্রান্সমিলেনিও বিআরটি সিস্টেমটি কলম্বিয়ার বোগোতা এবং সোচা শহরদ্বয়ের মধ্যে চলাচল করে। ২০০০ সালে চালুকৃত সিস্টেমটি ২০১৯ সাল নাগাদ আটটি লেনসহ শহর দুটি জুড়ে ১১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। যাত্রীরা ওভার ব্রিজ ব্যবহার করে স্টেশনে পৌঁছেন। মধ্যবর্তী চারটি লেন বিআরটি বাসের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম বিআরটি সিস্টেম ট্রান্সজাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অবস্থিত। ভিড়ের সময় ট্রাফিক কমাতে সহায়তার জন্য দ্রুতগতির পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু করতে এটি ২০০৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এটিতে বাসগুলো ডেডিকেটেড লেনে চলাচল করে এবং টিকিটের দামে আঞ্চলিক সরকার কর্তৃক ভর্তুকি দেয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ার ট্রান্সজাকার্তা বিশ্বের দীর্ঘতম বিআরটি সিস্টেম (২৫১ দশমিক ২ কিমি দীর্ঘ), যা প্রায় ৩ হাজার ৯০০ বাস পরিচালনা করে। ২০২০ সালে এটি গড়ে প্রতিদিন ৯ দশমিক ৮৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। লাহোর মেট্রোবাস পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের একটি বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট সার্ভিস। পাকিস্তানের লাহোর মেট্রোবাস পরিষেবাটি লাহোর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির লোকাল বাস সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নগর পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যা পার্শ্ববর্তী শহরতলির বাসিন্দাদের সংযুক্ত করে লাহোর জেলাজুড়ে একটি বিরতিহীন পরিবহন পরিষেবা পরিচালনা করে। লাহোর মেট্রোবাস পর্যায়ক্রমে চালুর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং ২০১৩ সালে চালু হওয়া প্রথম পর্যায়টি (২৭ কিমি) গাজুমাতা থেকে শাহাদ্র পর্যন্ত প্রসারিত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় দুটি স্থগিত রাখা হয়েছে, কারণ এগুলোকে লাইট রেইল প্রকল্পে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জনকল্যাণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও বাংলাদেশ তার উল্টো। ভুল পরিকল্পনা ও ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জনগণের ভোগান্তি বেড়েছে। ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ টেকসই উন্নয়নের অন্তরায় হলে এ ধরনের ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অনেক উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, রূপসা রেলসেতু প্রকল্প, খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, আখাউড়া-লাকসাম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশকিছু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। এসব ভুলের কারণে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জন যেমন ব্যাহত হয়, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কোটি কোটি টাকা খরচ করে তা ভেঙে ফেলা বা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। জনগণের টাকার অপচয় রোধ করা না গেলে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কখনই সম্ভব হবে না। এটি হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়ম, অস্বচ্ছতার কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় স্থাপনা ভুল পরিকল্পনা ও ভুল নকশায় নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় ও দায়িত্বহীনতার দায় এড়াতে পারেন না। তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো সতর্ক হবে এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ করবে। শিল্প অধ্যুষিত এ এলাকায় জনগণের ভোগান্তি কমাতে ও যানজট নিরসনে বিআরটি করিডোরটি সব যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখাই উচিত।