রাজধানী ঢাকা প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র বলে যেকোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে রাজধানীকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে অন্য জেলা শহরগুলো বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের যথাযথ উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ফলে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কিছুতেই কমছে না। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ এখনো রাজধানীকেন্দ্রিকই রয়ে গেছে। মোট বরাদ্দের ২১ শতাংশই পাচ্ছে ঢাকা জেলা। আর সবচেয়ে কম ভাগে পায় মেহেরপুর, শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) করা ‘বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের আঞ্চলিক বিন্যাস’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উন্নয়ন বরাদ্দের এ ধরনের অসম বণ্টন সরকারের উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা আরো মনে করেন, উন্নয়ন বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও টেকসই অর্থনৈতিক উদ্যোগ না থাকায় বাংলাদেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে না। ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর জন্য অন্যান্য জেলার ওপরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তাই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা সুষম উন্নয়নের স্বার্থে ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। কেননা ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর জন্য অন্যান্য জেলার ওপরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
আইপিডির গবেষণায় আরো বলা হয়, দেশের এডিপি প্রকল্পে মোট বরাদ্দের ৫০ ভাগই মাত্র সাতটি জেলা পাচ্ছে। এক্ষেত্রে স্বল্প বরাদ্দপ্রাপ্ত ২৫টি জেলা পাচ্ছে মাত্র ১৩ ভাগ। বৈষম্য পরিমাপক ‘পালমা রেশিও’ অনুযায়ী, এটি দেশের মধ্যে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের উচ্চবৈষম্যকেই নির্দেশ করে। আবার আঞ্চলিক বিবেচনায় বৃহত্তর ঢাকা (পুরনো বৃহৎ জেলা) পাচ্ছে শতকরা ৩২ ভাগ।
অবশ্য পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়ন বৈষম্য কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু জাতীয় প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আইপিডির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা বহুমুখী সেতু, পদ্মা রেলসেতু ও বঙ্গবন্ধু রেলসেতুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে—দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্য দক্ষিণাঞ্চল এলাকায় উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ মধ্যাঞ্চল ঢাকা ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম। ফলে এসব অঞ্চলের অনেক এলাকায়ই দারিদ্র্যের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন অঞ্চল পটুয়াখালী, খুলনা, কক্সবাজার প্রভৃতি এলাকায় অবকাঠামো, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা এসব এলাকার আঞ্চলিক উন্নয়নকে বেগবান করবে। এছাড়া বাংলাদেশের সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত এলাকা তথা পাহাড়ি অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, হাওর এলাকা ও চরাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করা দরকার।
বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম প্রশংসনীয়। কিন্তু অধিকাংশ অর্থনৈতিক অঞ্চলই ঢাকা ও চট্টগ্রামে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা সরকারের উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার সঙ্গে যায় না। বস্তুত আঞ্চলিকভাবে দেশের সুষম উন্নয়ন করতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের স্থানিক ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্প ও উন্নয়ন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন ও জাপানের মতো দেশ এভাবেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে সক্ষম হয়েছে।
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পনার স্বার্থে বৈষম্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি, সেসব এলাকায় বিশেষ বাজেট বরাদ্দ ও টেকসই অর্থনৈতিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভারসাম্য আনয়নের জন্য এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার বিকল্প নেই।
ঢাকামুখী জনস্রোত হ্রাস করা এবং ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করে তোলার স্বার্থেই পুরো বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে। এরই মধ্যে প্রতিটি জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি মাইলফলক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সরকারের একার পক্ষে এডিপির মাধ্যমে সারা দেশের সব অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হবে না। এজন্য বেসরকারি উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষ করে কুড়িগ্রামের মতো দারিদ্র্যপীড়িত জেলাগুলোকে অবহেলা করা যাবে না। এছাড়া সড়কপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট নির্মাণেও ঢাকার পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলকে গুরুত্ব দিতে হবে। অবশ্য প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ যে একেবারেই হয়নি, সেটিও না। তবে আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রণালয়কে ঢাকার বাইরে নেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন। মূলত ঢাকার ওপর চাপ কমাতে এ ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হলে উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও প্রাধান্য পাবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তাতে অন্য জেলায় বসবাসরত নাগরিকরা বঞ্চিত হয়। রাজধানীকে প্রাধান্য বেশি দেয়ায় যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় তা কাঙ্ক্ষিত জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক। এজন্য আগামী এডিপিতে অন্যান্য জেলার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেয়া হবে—সেটি আমাদের কাম্য। বস্তুত ঢাকা রাজধানী হওয়ায় বরাদ্দ বেশি পাবে আর মেহেরপুর দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা হওয়ায় কম বরাদ্দ প্রাপ্ত হবে, জাতীয় উন্নতির পথে এ ধরনের ভাবনা অন্তরায়স্বরূপ। আমরা প্রত্যাশা করব, উন্নয়নের পথচলায় কোনো অঞ্চল বা জেলাকে কম গুরুত্ব না দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা যেন গ্রহণ করা হয়। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পাশাপাশি অবহেলিত অঞ্চলগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য যে বৈষম্যমুক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে এডিপির বর্তমান বাস্তবায়নের ধরন উপযুক্ত নয়। এক্ষেত্রে পুরো দেশের কথা বিবেচনা করে সামগ্রিকভাবে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।










