ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব শেষ হয়েছে। পটুয়াখালীর খেপুপাড়া উপজেলার উপকূল দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার আগে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে রেমাল। সে তার ‘কাজ’ করে তার ছাপ রেখে গেছে। যখন রেমাল বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন আমাদের কেন্দ্রীয় মনোযোগ ছিল প্রধানত বাতাসের গতিবেগ কত, উপকূলের মানুষকে যথাসময়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে কিনা, বৃষ্টির পরিমাণ কেমন, উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস হয়েছে কিনা এবং সে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কত প্রভৃতি। পাশাপাশি, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের নেয়া ব্যবস্থা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, স্বেচ্ছাসেবকরা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তাদের তৎপরতা ঠিক আছে কিনা প্রভৃতি। বাংলাদেশের প্রায় সব স্থানীয় এবং জাতীয় প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন পো‍র্টাল, অনলাইন সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিকস মিডিয়া টাইম-টু-টাইম ঘূর্ণিঝড় রেমালের গতি, প্রকৃতি এবং অগ্রগতি পাঠক এবং দর্শকদের নিয়মিতভাবে আপডেট করেছে। আমরা তখন অত্যন্ত উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছিলাম যাতে অল্পের ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় রেমাল বাংলাদেশ অতিক্রম করে এবং উপকূলের প্রতিবেশ ও মানুষের অল্প ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে এ দুর্যোগ শেষ হয়। কিন্তু তাণ্ডব চালিয়ে রেমাল বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেলেও রেমাল তার তাণ্ডবের ছাপ রেখে গেছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জেলা-উপজেলাগুলোয়। কেননা রেমাল-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির যে সংবাদ এবং আখ্যান আমরা প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত জানতে পারছি তার পরিমাণ, সংখ্যা ও গুণের বিবেচনায় বিপুল। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের স‍‍র্বশেষ খবর অনুযায়ী, এ প‍‍র্যন্ত প্রায় ১৬ জন মানুষের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের প্রধান দুটি উপকূলীয় বিভাগ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ২৬৩টি স্থানে বেড়িবাঁধের ৪১ কিলোমিটার এলাকা বিধ্বস্ত হয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৪টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বরিশাল বিভাগে প্রাথমিক হিসাবে কৃষি খাতে ৫০৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুধু এ দুই বিভাগেই আংশিক ও পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় দেড় লাখ ঘরবাড়ি। ঘূর্ণিঝড় রিমালে ১৯টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার সংখ্যা ১০৭। গৃহহীন মানুষের বাইরেও ১৯ জেলায় আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৫৮টি ঘরবাড়ি। আর সম্পূর্ণ ঘরবাড়ির সংখ্যা ৪১ হাজার ৩৩৮। উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ভেসে গেছে হাজার হাজার মাছের ঘের ও পুকুর। বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা দুই জেলায় যেসব বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো সংস্কার করতে ২৬ কোটি টাকার মতো খরচ হবে বলে জানিয়েছেন খুলনার পানি উন্নয়ন বো‍র্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। খুলনা বিভাগের মোট ৪৩২টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা দুর্যোগকবলিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ লাখ ৬৯ হাজার ১৫৪ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে খুলনা জেলায়। এ জেলায় ৭৬ হাজার ৯০৪টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ২০০। খুলনা নগরে অসংখ্য গাছ উপড়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে সাতক্ষীরা জেলায় ১ হাজার ৪৬৮টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে সাতক্ষীরা শহরেও অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড়ে জেলার ১ হাজার ৪৬৮টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ৪৩ ইউনিয়নের মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার ১৭৬ মানুষ। খুলনা বিভাগীয় মৎস্য অফিস ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা তৈরি করেছে। তাতে দেখা গেছে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় মোট ৬০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় উপড়ে পড়েছে কয়েক হাজার গাছপালা। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা। ১৯ জেলার প্রায় পৌনে তিন কোটি লোক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বাগেরহাট জেলায়ও অন্তত ৪৫ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বরিশাল বিভাগে প্রাথমিক হিসাবে কৃষি খাতে ৫০৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বরিশাল জেলায় ক্ষতি হয়েছে ১১০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার। বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড়ে বিভাগের ছয় জেলায় কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১৮ হাজার ২০৯ হেক্টর জমির ফসল। কৃষিতে বরিশাল জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১১০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। চাইলে এ রকম আরো অনেক পরিসংখ্যান দেয়া যাবে এবং এসব ক্ষতির তালিকা আরো দী‍র্ঘ হবে সন্দেহ নেই। আবার এসব হিসাব-নিকাশের বাইরেও থেকে যাবে অনেক কিছু। যেমন কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ভোলা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ঝালকাঠি প্রভৃতি জেলায়ও ঘূ‍র্ণিঝড় রেমালের আঘাত হানার কথা। শেষ মুহূ‍র্তে রেমাল গতিপথ পরিব‍‍র্তন করে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আঘাত হেনেছে। কিন্তু এসব জেলায় জলোচ্ছ্বাস ও বাতাসের গতিবেগ অত প্রবল না হলেও বিশেষ করে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, ভোলা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া প্রভৃতি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ির ঘের, মাছের ঘের, পানের বরজ এবং লবণমাঠের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতির পরিমাণ কোটি কোটি টাকা। এভাবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় অনেক কিছুই বাদ পড়ে যাবে। 

তবু আমরা সাধুবাদ জানাই বাংলাদেশ ত্রাণ ও দু‍র্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে, যথাসময়ে ঘূ‍র্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ও প‍‍র্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় মানুষকে যথাসময়ে সরিয়ে নেয়ার কারণে মৃ‍ত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়েছে (যদিও ১৬ জনের মৃত্যুও কম নয়!)। ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা এবং পরিসংখ্যান আরো বড় হতে পারত। মিডিয়াও ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার কেননা মিডিয়া অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে ঘূ‍র্ণিঝড়ের সংবাদ এবং অগ্রগতি প্রকাশ ও প্রচার করেছে। এখন জরুরি বিষয় হচ্ছে, দু‍র্যোগ-পরব‍‍র্তী অবস্থায় ত্রাণ ও পুন‍‍র্বাসন ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে একটা সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে, শক্ত তদারকির (মনিটরিং) মাধ্যমে এবং একটি পদ্ধতিগত বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা। আমার অতীত অভিজ্ঞতায় ত্রাণ বিতরণে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দু‍র্নীতির কথা জানা আছে। প্রকৃত দু‍র্গতদের কাছে না পৌঁছে ত্রাণ ও পুন‍‍র্বাসনের চাল, ডাল, গম, টিন এবং নানা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী চলে যায় স্থানীয়ভাবে কতিপয় ক্ষমতাবানদের হাতে। ফলে সরকারের স‍‍র্বোচ্চ আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দু‍‍র্গত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কতিপয় দু‍র্নীতিবাজ, স্থানীয় ক্ষমতাবান এবং অ‍‍র্থলোভীদের কারণে ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটে। তাই রেমাল ঘূ‍র্ণিঝড়-পরব‍‍র্তী ত্রাণ ও পুন‍‍র্বাসন কা‍র্যক্রমের সুন্দর ও সুষ্ঠু বণ্টন ও বিতরণ ব্যবস্থার দিকে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে। যাতে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত, নিঃস্ব, দুস্থ ও দু‍র্গত মানুষ আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। সরকারি সাহায্য, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় আবার যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলব‍‍র্তী মানুষ লড়াকু। বছরের পর বছর ধরে উপকূলে বাস করে ঝড়, ঝঞ্ঝা, ঘূ‍র্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তুফান, টাইফুন, ট‍‍র্নেডো এবং বন্যাকে মোকাবেলা করে বাংলাদেশের উপকূলের মানুষ আজ বিশ্বব্যাপী দু‍র্যোগ ব্যবস্থাপনার মডেল হিসেবে স্বীকৃত। নিজেদের স্থানিক জ্ঞান (লোকাল নলেজ) দিয়ে তারা জানে কীভাবে দু‍র্যোগ মোকাবেলা করতে হয়। তাই এসব উপকূলের মানুষের প্রয়োজন সামান্য সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা। কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। ঘূ‍র্ণিঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা টিকে থাকতে পারে কিন্তু স্থানীয় লেভেলে দু‍র্নীতি, অনিয়ম ও পেশিশক্তির সঙ্গে মোকাবেলা করে তারা পেরে ওঠে না। কারণ তারা স্থানীয়ভাবে একটি অসম ক্ষমতা কাঠামোয় বাস করে। তাই আমি মনে করি, দু‍র্যোগ ব্যবস্থাপনার চেয়ে দুর্যোগ-পরব‍‍র্তী ব্যবস্থাপনা অধিকতর জরুরি!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়