দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যমতে, দেশের জিডিপির প্রায় ৬৫ শতাংশই ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। তবে অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও গত এক যুগে এ অর্থনৈতিক করিডোরের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে কিঞ্চিৎ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের মোট জিডিপিতে রাজধানী ঢাকার অবদান ৩৬ শতাংশ। ১৯ শতাংশ অবদান রাখছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ফেনীর মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরের মধ্যবর্তী এলাকাগুলোর অবদান আরো প্রায় ১০ শতাংশ। এভাবে জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক যুগে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে যা বিনিয়োগ হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় রেলপথ দিয়ে পণ্য পরিবহন বাড়ছে না। ফলে সড়কপথে চাপ বাড়ছে, যা সামাল দিতে পারছে না চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সক্ষমতার চেয়ে বেশি পরিমাণ যানবাহন চলায় মহাসড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে যাতায়াতে বাড়তি সময় লাগছে, পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণেও মোটা অংকের টাকা লাগছে।
অন্যদিকে রেলপথে বহুল সম্ভাবনা থাকার পরও ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে নির্মাণ করা দ্বিতীয় রেললাইনটির বেশির ভাগ অংশ মিটার গেজ। এ কারণে লাইনটির পণ্য পরিবহন সক্ষমতা কম। আবার রেলওয়ের প্রয়োজনীয় আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) সক্ষমতাও নেই। এক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরে অপ্রতুল বিনিয়োগের কারণে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দাবি, অবকাঠামো উন্নয়নে করিডোরটিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণ, পুরো রেলপথ ব্রড গেজ করা ও নতুন আইসিডি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করিডোরের ক্রমবর্ধমান ট্রাফিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই সরকার এসব কাজ করছে।
মন্ত্রণালয়গুলোর পক্ষ থেকে এমনটি বলা হলেও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর। এ করিডোরে বিনিয়োগে সরকারের বাড়তি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার পরিচয় দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বিদ্যমান চার লেন সড়কের সক্ষমতা কম হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে ও মূল্যবান সময়ও নষ্ট হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
দেশের প্রধান রফতানি পণ্য গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতের কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটা বড় অংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর ঘিরে গড়ে উঠেছে। এ করিডোরেই দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। ২০১৯ সালের পর সরকার নতুন করে আরো ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ৩৭টি বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় পড়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের পণ্য পরিবহনে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর ব্যবহার হবে। এমন প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোয় ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরে যানবাহনের চাপ ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা আরো বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। অথচ চার লেনের এ মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে।
এক্ষেত্রে বিগত সময়ে ২০১৩ সালে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। পরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করে সম্ভাব্যতা যাচাই, বিশদ নকশা এবং বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেনে উন্নীতের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ১১০ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে। এর বাইরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমাতে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা ও কুমিল্লার মধ্যে একটি কর্ড লাইন নির্মাণের জন্য বর্তমানে আরেকটি সম্ভাব্যতা করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার অদূরে গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নতুন একটি আইসিডি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে পণ্য পরিবহনে রেলের ভূমিকা বহুলাংশে বাড়বে বলে আশা করা যায়। তবে মহাসড়কের ক্ষেত্রে দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বস্তুত দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। অতীতের মতো অদূরদর্শী পরিকল্পনার তকমা যেন এ করিডোরের ক্ষেত্রে না বর্তায়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।










