দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম কেন্দ্র বলা যায়। প্রতি বছর এখানে বিভিন্ন দুর্যোগ হানা দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের পরিমাণ বেড়েছে। ১৯৭০ সালের গ্রেট সাইক্লোন নামে পরিচিত ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বড় মাত্রার ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় দেখেছে বাংলাদেশ। ১৯৭০, ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০৭, ২০১৯, ২০২০, ২০২২ সালের ঝড়গুলো ছিল বেশ ভয়ংকর এবং সর্বশেষ এবারের ঘূর্ণিঝড় মোখার তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। ঘূর্ণিঝড় মোখায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজারের দুই হাজার এবং সেন্ট মার্টিনের প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি। আসলে এমন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ঘরবাড়ি ধ্বংস, ফসলের খেত নষ্ট, মানুষের জীবনহানি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রাস্তাঘাট নষ্ট হওয়ার মতো ইত্যাদি ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লক্ষ করা যাচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বাড়ার কারণে মেরু অঞ্চলে বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রতি বছর অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তাপমাত্রার আকস্মিক ওঠানামা, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। প্রকৃতির এমন রূঢ় আচরণে বিশ্বজুড়েই জনজীবন নানাভাবে প্রভাবিত ও বিঘ্নিত হচ্ছে, বিশেষ করে আমাদের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ আরো বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে বঙ্গোপসাগর যেটা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে সহায়ক একটি জায়গা। আর জায়গাটির আকার অনেকটা ফানেল আকৃতি হওয়ার কারণে দক্ষিণা বাতাস উপকূলে এসে বিভিন্ন দুর্যোগ সৃষ্টির সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। সাধারণত ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় যা বঙ্গোপসাগরে বিরাজ করে। বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে ব্যাপক হারে। প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। এসব অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোই ঘূর্ণিঝড়ে বেশি আক্রান্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে সমুদ্রের পানি আবাদি জমিতে প্লাবিত হওয়ার মাধ্যমে চাষের জমিকে অযোগ্য করে তোলে। আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় তাই প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা প্রস্তুতি নেয়া হয়ে থাকে। তবে ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণনির্ভরতা থেকে সরে এসে দুর্যোগ সহনীয় দেশ হিসেবে গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকতে ও দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজন পরিকল্পিত বনায়ন প্রকল্প। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, দেশের মোট জমির শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। তা না তাহলে সেখানকার পরিবেশ ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকবে। 

এবারের ঘূর্ণিঝড় মোখায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কারণ আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় ম্যানগ্রোভ ও সাধারণ বনাঞ্চল নেই বললেই চলে। উপকূলীয় অঞ্চলের বনাঞ্চল দুর্যোগের সময় অনেকটা আমাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এমনটাই হয়ে থাকে সুন্দরবন এলাকায়। সেখানে প্রাকৃতিক ঝড় থেকে সুন্দরবন আমাদের বুক দিয়ে আগলে রাখে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কক্সবাজারে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বনাঞ্চলের বড় অংশ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এর আগে এ অঞ্চলে ব্যাপক বনাঞ্চল ছিল। ম্যানগ্রোভের পাশাপাশি সাধারণ বনাঞ্চলও কমেছে ব্যাপক হারে। কক্সবাজারে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে এতদিন কাজ করেছে চকরিয়াসহ আশপাশের বনাঞ্চল। বছরখানেক আগেও সেখানে ছিল মিনি সুন্দরবন। একসময় যার আয়তন ছিল প্রায় ৪৫ হাজার একর। সে জমি লিজ নিয়ে নির্বিচারে বন উজাড়ে নামেন প্রভাবশালীরা। কাগজ-কলমে এখন ২১ হাজার একর বনাঞ্চল থাকলেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কেওড়া, বাইন ও নুনিয়া গাছের বনটির অস্তিত্ব বিলীন করে সেখানে চলছে চিংড়ি ও লবণ চাষ। টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও সোনাদিয়ার মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয়ও ছিল ম্যানগ্রোভ বন। সেগুলো এখন নেই, উজাড় ভূমি হয়ে পড়েছে। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্প অ্যান্ড ফরেস্ট লস ইন কক্সবাজার, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে বনভূমি উজাড়ের পরিমাণ বেড়েছে তিন দশক ধরে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা সেখানে বসতি গড়ার পর আরো বড় আকারে বনভূমি উজাড় হতে থাকে। অন্যদিকে বন বিভাগের দাবি, রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আট হাজার একর জমির বন ধ্বংস হয়েছে। এ ক্ষতির পরিমাণ দিন দিনই বাড়ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য। রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনের কারণে ধ্বংস হওয়া বনাঞ্চলের ক্ষতির মোট আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা হয়েছে ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার কারণেই ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত একটি দেশ। ফলে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেও প্রতি বছর ঝড়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জানমালের ক্ষতির পাশাপাশি সে সময়ে অন্যান্য ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় এ দেশের জনগণকে। আর এসবের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিকল্পিত সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সবুজায়ন কেবল কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণে কার্যকর তা-ই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়ও এ সবুজ বনায়ন কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ব্যাপক বনায়ন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে আমাদের কিছুটা রক্ষা করতে পারে। তাই ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত মোকাবেলায় উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনায়ন গড়ে তোলা এখন সময়ের অন্যতম প্রয়োজন হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যাতে কূল পার হয়ে মিঠাপানিতে মিশতে না পারে; সেজন্য পর্যাপ্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। পানিদূষণ প্রতিরোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনার জন্যও সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন আমাদের। অন্যদিকে যেহেতু বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন আমাদের কৃষকরা। তাই কৃষিজীবীদের কথা মাথায় রেখেও পরিকল্পিত বনায়ন হতে পারে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এমনটা করতে আমরা ব্যর্থ হলে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি খাত। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের উপকূলজুড়ে বন উজাড় হওয়ার কারণে যে সংকট বিদ্যমান, তা নিরসনে দ্রুত সরকারকে বনায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারকে আরো বেশি উদ্যোগী ও আন্তরিক হতে হবে। আর যথেষ্ট পরিমাণে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল তৈরি করতে পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দেশ, জনজীবন, অর্থনীতি, কৃষি, বনজ সম্পদ, পরিবেশ, অবকাঠামো ইত্যাদি রক্ষার মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে সক্ষম হব।