বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কমে এলেও দেশে কোনো প্রভাব পড়েনি। বিগত অর্থবছরে স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ডও রয়েছে। গত জুনে এ হার কিছুটা কমলেও খাদ্যদ্রব্যে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতির লাগামহীন অবস্থা বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভবিষ্যতে গভীর সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও মূল্যস্ফীতি কমেছে। দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা, প্রতিবেশী দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনো রেশ পড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান মতে, বিগত অর্থবছরের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল এক যুগের সর্বোচ্চ, ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আবার বিবিএসের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিগত অর্থবছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল, যা ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু মে মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা আবার জুনে এসে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যদিও জুনে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির এ উল্লম্ফন যুগপৎ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির করুণ দশাকে চিত্রায়িত এবং সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নির্দেশ করে। অর্থশাস্ত্রে মূল্যস্ফীতিকে প্রবৃদ্ধি-হন্তারক কর্কট রোগ বলা হয়। দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব নেশনস গ্রন্থে রুচির শর্মা বলেছেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের জন্য ৪ শতাংশের ওপর আর উন্নত দেশগুলোর জন্য ২ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি উদ্বেগজনক।’

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগ আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামায় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়ে। কিন্তু গত ছয় মাসে প্রায় সব দেশেরই মূল্যস্ফীতির চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, খাদ্যশস্য, সার, কৃষি খাতের কাঁচামাল, সার এবং ব্যবহারিক বা শিল্প ধাতুর মূল্যও টানা কয়েক মাস ধরে হ্রাস পাচ্ছে। কডিভ-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরেছে ভোগ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম কমলেও বিপরীত চিত্র দেশের বাজারে। বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম এখনো অস্থিতিশীল। ফলে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কেননা গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পেলেও খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পণ্য আমদানি থেকে ভোক্তা এবং উৎপাদন স্তর থেকে ভোক্তা স্তরে বাজার ব্যবস্থাপনা খুব দুর্বল। এক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহ, সরকারের নিজস্ব মজুদ এবং আমদানির মধ্যে সমন্বয় থাকলে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি হ্রাস করা সম্ভব হতো। 

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি না কমার সম্পর্ক রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মত দেন। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশ চাপে রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত ক্ষয় হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোরও আমদানির সক্ষমতা কমে গেছে। এর সঙ্গে মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন অর্থবছরের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দেয়া হয়েছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক না হলে এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে না। কারণ জ্বালানি তেলসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম কমেছে। কিন্তু দেশের বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। যেসব পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সেগুলো আর কমার সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারণ দেশের বাজার ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করছে।

অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোরও মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী। এমনকি শ্রীলংকায়ও মূল্যস্ফীতি কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিয়ন্ত্রিত না হলেও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে সুসমন্বিত পরিকল্পনার যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। তাই দ্রব্যমূল্য বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের বাজারে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হতে হবে। এজন্য বাজার ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকির কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার বৃদ্ধি করলে তা মূল্যস্ফীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিগত অর্থবছরে দ্রব্যমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে সে অবস্থান পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা চলতি মাস থেকে কার্যকর হবে। আমরা আশা করব মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উদাহরণের আলোকে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় করণীয় পদক্ষেপগুলো নেয়া হবে, সেটিই আমাদের কাম্য।