বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নাসিরুজ্জামান। এর আগে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কৃষি খাতের সংকট, সম্ভাবনা ও কৃষি ঋণ বিতরণ নিয়ে সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহাদাত বিপ্লব

সার্বিক কৃষি উৎপাদন বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী বাংলাদেশের কৃষি খাত এগোতে পেরেছে কি?

বাংলাদেশে কৃষির অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে। আগে ধানের নতুন অনেক জাত এলেও তা সমন্বয় ও সম্প্রসারণের অভাবে কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হতে ১২-১৫ বছর সময় লেগে যেত। তখন আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে একটি বরাদ্দ নিয়ে আসি। যার ফলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিএডিসি বীজ কিনে নিত। এরপর বিএডিসির সে বীজ আবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিনে নিত প্রদর্শনী বা প্রণোদনা দেয়ার জন্য। প্রতি ইউনিয়নে অন্তত একটি প্রদর্শনী দেয়া হতো। যার ফলে কারো কোনো লোকসান হতো না। এতে দেখা গিয়েছে, যেকোনো জাত আগের চেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। শুধু ধান নয়, অন্যান্য ফসলেও এ পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে। আমাদের এখন প্রায় চার কোটি টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। চাল আমদানি না করলেও এখন আমাদের সমস্যা নেই। এছাড়া জলবায়ুসহিষ্ণু বিভিন্ন স্বল্পকালীন ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। আগে উত্তরবঙ্গে মঙ্গা হতো। মানুষ খেতে পারত না। এখন নতুন জাতের কারণে মঙ্গার সময়ে ফসল উঠে যাচ্ছে। যার ফলে কেউ অভুক্ত থাকছে না। বলা চলে, সার্বিকভাবেই কৃষির উৎপাদন বেড়েছে। আবার প্রচলিত কৃষিপণ্যের বাইরে অনেক অপ্রচলিত কৃষিপণ্য রফতানি হচ্ছে। বেসরকারি খাত রফতানিতে অনেক ভালো করছে। 

বাংলাদেশের কৃষি খাত কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে? এর সমাধান কী হতে পারে?

আমাদের দেশে কৃষির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভৌগোলিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর অনেক ফসল নষ্ট হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা রয়েছে। এটা আসলে প্রাকৃতিক বিষয়। ফলে স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। এরপর সমস্যা হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং কোয়ালিটি খাদ্য উৎপাদন করতে না পারা। বিশ্ববাজারে সবজির অনেক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে উত্তম কৃষিচর্চা মেনে সবজি চাষ হয় না। ফলে বিদেশের বাজারে খুব বেশি রফতানি হচ্ছে না। দেশে গ্রিনহাউজের বিকল্প হিসেবে স্বল্প মূল্যে বাস্তবায়ন করা যাবে এমন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। তাহলে একদিকে দুর্যোগ থেকে যেমন ফসল রক্ষা পাবে, তেমনি মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। স্বল্প সময়ে অধিক উৎপাদনশীল এমন জাত উদ্ভাবনে আরো গুরুত্ব বাড়াতে হবে। এখন সবচেয়ে বড় আরেকটি সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে সেটা সবাইকে ভুগতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে বাজারের সঙ্গে কৃষকের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো অপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি হওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশে আম পর্যাপ্ত উৎপাদন হয়। তাও দেখা যায় আম আমদানি করা হয়। এটা বন্ধ করতে হবে।

আগামী দিনে বাংলাদেশের কৃষিতে সম্ভাবনার কী দেখছেন?

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রফতানির একটি বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের মোট ভূমির এক-দশমাংশ পাহাড়ি। সেখানে জুমচাষীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুম চাষ ও সাধারণ চাষ অর্থাৎ সমন্বিত চাষাবাদ কীভাবে করা যায় তার একটা মডেল দাঁড় করাতে হবে। যেমন আম গাছের পাশাপাশি জুমের অন্য ফসলগুলোও চাষ করা যায়। যখন দীর্ঘস্থায়ী কোনো গাছ থাকে না তখন তারা পুরো জুমের এলাকা পুড়িয়ে ফেলে। আরেকটি সম্ভাবনার জায়গা হলো চর ও রিভার বেড। নদীতে পানি থাকাকালীন যে এলাকা ভরাট থাকে সেটা হলো চর। আর নদী শুকিয়ে গেলে যে জমিতে চাষাবাদ করা যায় সেটা হলো রিভার বেড। অর্থাৎ নির্ধারিত একটি সময়ে রিভার বেডে চাষাবাদ করা যায়। কুড়িগ্রামে একটি এনজিও জরিপ করেছিল। সেখানে দেখা যায়, ৮০ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে এমন রিভার বেড। এসব জমিতে কুমড়া, ভুট্টা ও কাউনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ হয়। কিন্তু আমরা এর যথাযথ ব্যবহার করতে পারছি না। এর নিচের দিকেও এখন শীতকালে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এগুলোর যথাযথ ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। 

সার্বিকভাবে কৃষি এগোলেও কৃষকের অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে?

দেশে ৪৮ শতাংশ কৃষক লিজ নিয়ে জমি চাষ করছেন। কৃষক যে শুধু ন্যায্যমূল্যই পাচ্ছেন না তা নয়, বরং মৌলিক সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রান্তিক কৃষকদের গিলে খাচ্ছে। কৃষিকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কৃষকের পক্ষে দরকষাকষি করার কেউ নেই। তারা দরকষাকষি করতে পারেন না। বাংলাদেশে অনেক দল বা সংগঠন তৈরি হয়েছে। কিন্তু তারা আসলে কৃষকের স্বার্থরক্ষায় খুব বেশি কাজ করছে না। এজন্য সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। ফার্মারস মার্কেট তৈরি হলে কৃষকের স্বার্থ কিছুটা হলেও রক্ষা করা যাবে। বাজারে সব কৃষিপণ্যের দাম বেশি থাকলেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। উৎপাদনকারীরা মূল্য না পেলে কৃষি হুমকিতে পড়বে। 

কৃষি ঋণ নিতে গিয়ে কৃষকরা ভোগান্তির শিকার হন। স্থানীয়ভাবে অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা নিজের ও প্রভাবশালীদের নামে কৃষি ঋণ বিতরণ করার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা?

সিস্টেমের কারণে কৃষকরা কিছু ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক কর্মকর্তা তা বুঝতে পারেন না। ফলে অজ্ঞতার কারণে অনেকে বাণিজ্যিক লোন হিসেবে বিতরণ করে ফেলেন। কৃষি ঋণ অন্য খাতে বিতরণ করার সুযোগ নেই। চলতি অর্থবছরে ৪২টি ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয়া হয়েছে। এর বাইরেও কৃষি ব্যাংক ১৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ঋণ দেয়ার কারণে বড় ঋণ খেলাপির ঘটনা ঘটেছে। বাণিজ্যিক ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল?

বাণিজ্যিক ঋণের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কারণ যেকোনো ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান থাকতে পারে। সব ব্যাংক তিন-চারটি করে ইনসেনটিভ পায়। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলো পায় না। কারণ লাভ নেই। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমতি দেয়। আমাদের লক্ষ্য হলো, বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে আয় করা। আমাদের ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম। যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আরো কঠিন হব। 

কৃষি ঋণকে কীভাবে কৃষকের জন্য আরো সহজ করা যায়?

আগে কৃষকের নিজের নামে জমি না থাকলে কৃষি ঋণ দেয়া যেত না। ঋণের অন্যতম শর্তই হলো ঋণগ্রহীতার নিজের নামে জমি থাকতে হবে। কিন্তু এখন যিনি জমি চাষ করেন তিনিও ঋণ নিতে পারেন। অর্থাৎ কেউ যদি লিজ নিয়ে জমি চাষ করেন তিনিও কৃষিঋণ নিতে পারবেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ঋণ নিতে পারবেন। দেশে এখনো ৭৪ শতাংশ কৃষক দাদন, মহাজন ও এনজিও থেকে ঋণ নেন। বাকি ২৬ শতাংশ হলো কৃষিঋণ। এনজিও ঋণ দিলে কৃষকের ব্যবহার্য জিনিস পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে শিথিলতা রয়েছে। কৃষি ঋণে বৈচিত্র্য আনতে হবে। কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের ভাবনায় প্রথমেই আসে চাষাবাদ। কিন্তু রফতানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দিতে ঋণ দিতে হবে। ব্যাংকের ম্যানেজারদের উচিত, মাঠপর্যায়ে যারা সত্যিকারের কৃষক ও কৃষি নিয়ে কাজ করেন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য দেয়া। সার্বিকভাবে সমন্বয় বৃদ্ধি পেলে দেশের কৃষি খাত আরো এগিয়ে যাবে।